• ক্রিকেট

ঊনত্রিশের গল্প

পোস্টটি ২১২৬ বার পঠিত হয়েছে

খুব বেশী ভাবালুতা তাঁকে পেয়ে বসেনি কখনো, ভাবাবেগকে প্রশ্রয়ও দেননি খুব একটা। তবুও গতরাতে হঠাৎ মনটা কেমন যেন করে উঠল! সারাটা জীবন একগ্রতার সাথে এই কাজটিই তো করে এসেছেন, ক’দিন বাদে আর তা করা হবে না! ভাবতেই গা-টা কেমন যেনো শিউরে উঠেছে!

এই মনোরম গ্রীষ্ম বছর ঘুরে আবার ফিরবে, হেডিংলির অনিন্দ্য সুন্দর সুনীল আকাশ আবার ভরে উঠবে, কেবল তিনিই আর ফিরবেন না এখানে! হেডিংলি তাঁকে দু’হাত ভরে দিয়েছে সবসময়। যেনো তিনি লীডসের বরপুত্র, তাঁকে এই প্রাঙ্গণ যেভাবে সমাদর করেছে, পৃথিবীর আর কোথাও তেমনটা পাননি তিনি। এখানটায় যতবার কাষ্ঠখন্ড নিয়ে নেমেছেন ততবার তিনি সেঞ্চুরীর দেখা পেয়েছেন, কেবল এবারই এখনো পেলেন না।

এই সফরে এখনো একটা ম্যাচেও হারেননি। এই ম্যাচে কি তবে হেরে যাবেন?

ইংলিশদের সংগ্রহ ইতিমধ্যেই চারশো হয়ে গেছে। ইয়ার্ডলি কি ভাবছে কে জানে! ইনিংস ঘোষণা কি করবে না সে? নাকি (গডফ্রে) ইভানসের ফিফটির অপেক্ষা করছে?

তিনি হারতে পছন্দ করেন না একদম। ড্রয়ের জন্য খেলতেও ইচ্ছে হয় না তাঁর। তিনি শুধু জেতার জন্য খেলেন, যে কোনো বিনিময়ে জিততে চান। কিন্তু অবস্থা এমন যে, তিনি বা তাঁর দল জয়ের মতো অবস্থায় নেই। হয় ওরা জিতবে, না-হয় ম্যাচ ড্র হবে হয়তো।

 

যেবার প্রথম এখানে পা রাখেন, তখন বাইশের টগবগে তরুণ তিনি। প্রবল আগ্রহ আর ভীষণ বিস্ময় নিয়ে দেখছিলেন সব। স্যার জ্যাক ‘দ্য মাস্টার’ হবসের বিদায়ী সিরিজ বলে তাঁকে আরো বেশী করে দেখছিলেন। লোকে যে তখনই তাঁকে স্যার হবসের তুলনা করতে শুরু করে দিয়েছিল!

ফর্মের তুঙ্গে ছিলেন সেবার। মাঠে নামেন আর সেঞ্চুরী করেন, তাঁর সেঞ্চুরী পাওয়া নয়- তাঁর রান না-পাওয়াটাই যেনো খবর হয়ে উঠে! আজ আর মনে নেই প্রথম দেখাতেই লীডস-কে ভালোবেসে ফেলেছিলেন কি না, তবে লীডস যে তাঁকে ভালোবেসে ফেলেছিল, তা তিনি নিশ্চিত। নইলে অমন সর্বস্ব উজার করে দেয়া কেন!

 

লর্ডসের ২৫৪ ছাড়িয়ে প্রথম ট্রিপলটা তো এখানেই পেয়েছিলেন। এ্যান্ডি স্যানডহামের ৩২৫-কে দ্বিতীয়তে ঠেলে দিয়ে ৩৩৪ এর চূড়ায় উঠেছিলেন তো হেডিংলির এই আকাশকে সাক্ষী রেখেই। বছর চারেক পরের দ্বিতীয় ট্রিপলের সাক্ষীও তো লীডসের এই সবুজ ঘাস আর হেডিংলির ওই সুবিশাল সুনীল আকাশ!

হেডিংলির এই জল-হাওয়া বরাবরই তাঁর জন্য পয়মন্ত রুপেই আত্মপ্রকাশ করেছে। কখনোই হারেননি তিনি এখানে, সর্বশেষ যেবার এসেছিলেন সেবার তো জিতেই ফিরেছিলেন। অশান্তি আর হানাহানির অশনি সংকেত তখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়েই।

ওফ, সে কী বিভীষিকা! আটটি বছর তাঁর জীবন থেকে গিলে খেয়ে ফেলেছে।

 

এবার কি কখনোই না-ঘটা সে ঘটনা ঘটে যাবে? লীডসে তিনি হেরে যাবেন? হেডিংলির বাতাস আর তাঁর পক্ষে বইবে না? এই মাঠ থেকে প্রথমবারের মতো সেঞ্চুরীহীন হয়ে ফিরবেন তিনি? এই সফরে অপ্রতিরোধ্যে তাঁর দলটা আত্মসমর্পণ করবে, তাঁরই প্রিয় মাঠটায়?

কোনো সিরিজেই এত দূরাবস্থা ছিল না তাঁর। জার্ডিনের বডিলাইন, ভোস-লারউডরাও তাঁকে এভাবে দমিয়ে রাখতে পারেননি। পুরো সফরে কেবল একটা সেঞ্চুরী পেয়েছেন, নটিংহ্যামে; আর লর্ডসের শেষ ইনিংসে করেছিলেন ৮৯, এছাড়া বলার মতো আর কোনো স্কোর নেই তাঁর।

তবে কি তিনি বুড়িয়ে গেছেন? ভোঁতা হয়ে গেছে তাঁর ব্যাট, জং ধরে গেছে তাঁর রানমেশিনে?

সারাটা জীবন চ্যালেঞ্জ ভালোবেসেছেন। নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, জিতেছেন। এবার ক্যারিয়ার সায়াহ্নে এসে এই চ্যালেঞ্জটা জিততে পারবেন তো তিনি? লীডসের সঙ্গে সেঞ্চুরী-সখ্যতা অটুট থাকবে কি তাঁর? হেডিংলির সাথে অপরাজেয় ভাবটা বজায় রাখতে পারবেন কি তিনি?   

 

দিনের খেলা শুরু হওয়ার মিনিট কয়েকের মধ্যেই ইনিংস ঘোষণা করলেন, নরম্যান ইয়ার্ডলি। ইয়ার্ডলি কি তাঁর সাথে মনস্তাত্ত্বিক চাল চাইতে চাইলো? আচ্ছা, দেখা যাবে!

৪০৪ রানের পাহাড়সম টার্গেট সামনে, এই দুঃসাধ্য পাহাড় ডিঙানোর কল্পনা করে কোন বোকা? বছর কুড়ি আগে রেকর্ড ৩৩২ চেজ করেছিল ইংল্যান্ড, মেলবোর্নের সেই ম্যাচেও তাঁর সেঞ্চুরী ছিল।  সাটক্লিফের চতুর্থ ইনিংসের সেই ‘ক্ল্যাসিক ১৩৫’ তাঁকে তো বটেই, ম্লান করে দিয়েছিল হ্যামন্ডের প্রথম ইনিংসে দ্বিশতককেও!

নিয়তির কি অদ্ভুত সম্মিলন! সেই রেকর্ড রান তাড়া ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম সিরিজে, তরুণ বয়সে। আর এবার এই রেকর্ড রান তাড়া তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ সিরিজে, এখন তিনি পৌঁছেছেন চল্লিশে!

 

ওপেনার হ্যাসেটকে হারিয়ে কাটিয়ে দিলেন লাঞ্চ পর্যন্ত, তাঁর সঙ্গী রইলেন অপর ওপেনার আর্থার মরিস। তখনও ইংল্যান্ড বা বিশ্বক্রিকেট জানে না, পরের কয়েক ঘন্টায় কোন নতুন ইতিহাস যে রচিত হতে যাচ্ছে!

ডেনিস কম্পটন অনিয়মিত বোলার ছিলেন, চায়নাম্যান বোলিং করতেন। কম্পটনের ‘রং আন’ খেলতে সমস্যা হচ্ছিল তাঁর, সে কথা মরিসকে বলতেই, মরিস বললেন- ওকে বস, আমি দেখছি! এছাড়া আর কোনো সমস্যাতেই পড়তে হয়নি তাঁকে। গত কুড়ি বছর ধরেই তো এমন নির্ঝঞ্চাট ব্যাটিং করে গেছেন।

চা-বিরতি পর্যন্ত মরিসকে সাথে নিয়ে নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেয়ার পর তিনি ও তাঁর দল বুঝলেন, এই ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাঁরা নিয়ে নিয়েছেন।

 

লীডসের সঙ্গে সখ্যতাটা অটুট থাকলো তাঁর, লীডসে চার টেস্টের প্রতিটিতেই পেয়েছেন সেঞ্চুরী। ১৯২.৬০ গড়ে করেছেন ৯৬৩ রান। এই মাঠে একদিনে ট্রিপল করলেও, টেস্টের শেষদিনে ও চতুর্থ ইনিংসে তাঁর কোনো সেঞ্চুরী ছিল না এখানে। আগের ২৮টি সেঞ্চুরীর দুটি চতুর্থ ইনিংসে হলেও, একটাও দলকে জেতাতে পারেনি; হেডিংলি সেই অপূর্ণতাও ঘুচিয়ে দিয়েছে তাঁর। তিনি চতুর্থ ইনিংসে অপরাজিত সেঞ্চুরী করে দলকে জেতাননি শুধু, তরতর করে অতিক্রম করেছেন দূর্লঙ্ঘ্য এক চূড়াও!

 

ইয়ার্ডলির দলটাকে অবিশ্বাসের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি যখন মাঠ ছাড়ছেন, তখন ৭ হাজার থেকে মাত্র ৪টি রান দূরে আছেন তিনি। শতগড়ও তাঁর রানের পাশে তখন ঝকমকিয়ে হাসছে। ক্যারিয়ার জুড়ে দর্শক চোখকে অবিশ্বাসে ‘ছানাবড়া’ করেছেন বারবার, ক্যারিয়ার সায়াহ্নে করলেন আরো একবার।

কিন্তু তিনি বা তাঁর অবিশ্বাস্য কীর্তিতে বিমুগ্ধ দর্শককূল তখন জানে না, নিয়তি কি নিষ্ঠুরতা নিয়ে অপেক্ষা করছে লন্ডনের দ্য ওভালে! আরো একবার চক্ষু ‘ছানাবড়া’ হয়েছে সত্যি, তবে এবার আর তাঁর কাষ্ঠখন্ডের কারুকাজে নয়, বরং কাষ্ঠখন্ডকে ফাঁকি দিয়ে টুপ করে স্ট্যাম্পের বেলটা পড়ে গেলে! বেল ফেলে দেয়ার কীর্তি যার, সেই হলিসও কান্ড ঘটিয়ে নিশ্চয় খুব একটা খুশি হননি!

 

থাক, সে মন খারাপের গল্প।

আজ শুধু তাঁর ঊনত্রিশের অবিশ্বাস্য গল্পের রেশটাই থাকুক। সোয়া চার ঘন্টায়, ২৯টি চারে হেডিংলির আকাশ-বাতাস, লীডসের সবুজ ঘাস ও কালের ২৭শে জুলাইকে সাক্ষী রেখে যে অসাধ্য সাধনের সাধক হয়েছিলেন, সে গল্পই স্মৃতিতে সজীব থাক আজ। তাঁর অবিশ্বাস্য কীর্তির বিহ্বলিত আবেশটাই সঙ্গী হোক আমাদের, ব্যাটিং সম্রাটের জন্য বরাদ্দ থাকুক সসম্ভ্রম মুগ্ধতা!

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।