• ফুটবল

রজারিও কেনি : একজন গোলকিপার হয়েও যিনি কিনা শ'খানিক গোলের মালিক

পোস্টটি ২৫৮৩ বার পঠিত হয়েছে

২০১১, ৭ মার্চ! দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম সেরা ডার্বিতে মুখোমুখি সাও পাওলো এবং করিন্থিয়ান্স! চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী করিন্থিয়ান্সের বিপক্ষে গত ১১ ম্যাচে জয়ের মুখ দেখেনি সাও পাওলো, চার বছর ধরে অন্তত একটা জয় পাওয়ার জন্যে মুখিয়ে সাও পাওলোর সকল ফ্যান! সেকেন্ড হাফের শুরুতেই সাও পাওলো উইঙ্গার ফার্নান্দিনহো দুজনকে কাটিয়ে ডিবক্সে বল নিয়ে ঢোকার সাথে সাথে ফাউলের শিকার হোন, পেনাল্টি পেয়ে যায় সাও পাওলো।

পেনাল্টি নেওয়ার জন্যে এগিয়ে আসছেন, সাও পাওলোর সবচেয়ে পুরানো যোদ্ধা, সাও পাওলোর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর, ভক্তদের আস্থার প্রতিনায়ক; যিনি কিনা এর আগে গোল করেছেন ৯৯ খানা, গোলের সেঞ্চুরি হওয়ার অপেক্ষায়! কিন্তু এ আর এমন কি, প্রোফেশনাল ক্যারিয়ারে ১০০ গোল কি এমন! কিন্তু গোলের সেঞ্চুরির অপেক্ষায় থাকা মানুষটা যদি হয় একজন গোলকিপার!? তখন সেই অপেক্ষার মুহুর্ত কি কেবলই একটা গোলের?? উহু! বরং এ মাহেন্দ্রক্ষণ বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসে একজন গোলকিপারকে অন্য ভাবে এক অনন্য উচ্চতায় চেনানোর কিংবা পৌছানোর উপলক্ষ!

তিনি আসলেন, বল বসালেন, একটু পিছিয়ে, রান আপ নিলেন! মুহুর্তেই করিন্থিয়ান্সের মাঠে পিনপতন নিরবতা! কিন্তু অন্যপাশে আকাশ ছোঁয়ার উল্লাস! সাও পাওলো বাসীর বাঁধভাঙা উল্লাস, বিশ্বমিডিয়ায় হেডলাইনে ছয়লাপ!

"রজারিও কেনি - একজন গোলকিপারের শততম গোলের কীর্তি"

হ্যা, একজন রজারিও কেনি! রজারিও'র গোল ফ্যানরা আগেও দেখেছে অনেকবার, কিন্তু এইটা স্পেশাল! একজন গোলকিপারের গোলের সেঞ্চুরি! শুধুই কি সাও পাওলো?? পুরো ব্রাজিল জুড়ে, রজারিও যেনো এক মুগ্ধতার নাম! পথে ঘাটে ব্রাজিল জার্সির পিছনে একটিই নাম দেখা যেতো কিছুদিন, R. Ceni – 01!

গোলের সেঞ্চুরি করাকালীন সময়ে রজারিও'র বয়স ইতিমধ্যে ৩৮ পেড়িয়েছে, এর পরেও আরো সাড়ে চার বছর বিশ্বস্ত হাতে সাও পাওলোর একমাত্র চয়েস হিসেবে গোলবার সামলিয়েছেন! ২০১৫ সালে রজারিও অবসর নেন, ২৫ বছরের এক রাজকীয় ক্যারিয়ার শেষে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে এসেছিলেন ক্লাবে, ২৫ বছরে ১২৩৮ ম্যাচ, সাথে অবিশ্বাস্য এক পরিসংখ্যান - ১৩২ গোল, যার ৬১ টি ডিরেক্ট ফ্রি কিকে, ৭০ টি পেনাল্টিতে আর বাকী একটি এসেছিলো ওপেন প্লে থেকে! পরিসংখ্যান দিয়ে কিছু খেলোয়াড়কে পরিমাপ করা যায়না, কিন্তু এই পরিসংখ্যানই একজন রজারিও কেনি'কে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়, অসম্ভব এক সফলতায়!

গোলের সেঞ্চুরির রেকর্ড রজারিও কে দিয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোল করা গোলকিপারের খেতাব, পাশাপাশি পেলের পরেই এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ব্রাজিলিয়ানের রেকর্ড! একজন খেলোয়াড় হিসেবে যা জেতার কথা, রজারিও জিতেছিলেন তার সবই - ব্রাজিলিয়ান লীগ শিরোপা, কাপ শিরোপা, কোপা লিবার্তোদেস, ক্লাব বিশ্বকাপ, এমনকি ব্রাজিলের ২০০২ ফুটবল বিশ্বকাপ জয়েও রয়েছে তার নাম, ট্রফি ছুয়ে দেখার সাধ্য হলেও মাঠে নামা হয়নি কেনি'র! ক্লাব বিশ্বকাপে হয়েছিলেন টুনার্মেন্টের সেরা খেলোয়াড়!

ইউনাইটেডে গিগস কিংবা রোমায় টট্টি যেমন, সাও পাওলোবাসীর কাছে একজন রজারিও ঠিক তেমন; যেনো প্রত্যেকের ঘরের আপন ছেলে! অথচ ২৫ বছরের এই যাত্রার মানুষটার জন্মলগ্নই ছিলো প্রায় হারিয়ে যাওয়ার! সে গল্পে যাওয়া যাক!

কেনি যখন উনার মা'র পেটে, তখন উনার মা'র শারীরিক কিছু সমস্যা দেখা দেয়; যার দরুন ডাক্তার গর্ভপাত করানোর উপদেশ দেন নয়তো সন্তান জন্ম দেওয়ায় শারিরীক জটিলতা মৃত্যু অব্দি পৌছায় দিতে পারে! কিন্তু সকল জটিলতা পাশ কাটিয়ে একটা সময়  ছোট্ট রজারিও পৃথিবীর আলো দেখেন! ব্রাজিলের পারানা স্টেটে ১৯৭৩ সালের ২২ জানুয়ারি জন্ম নেন তিনি!

কিশোর বয়সে কেনি'র ফ্যামিলি মাতো গ্রোসো শহরে পাড়ি জমায়। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকে স্থানীয় এক ক্লাব শিনোপ এফসি দিয়ে যাত্রা শুরু রজারিও'র! এখানে কখনো ফুলব্যাক বা কখনো গোলকিপার হিসেবে খেলতেন কেনি! পরে, বাবার অনুপ্রেরণায় কেবলই গোলকিপিং পজিশনে নজর দেন কেনি! কেনি'র বাবার মতে, গোলকিপিং ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং স্পেশাল পজিশন!

১৯৮৯ সালে শিনোপ ম্যানেজার রজারিও'র মাত্র ১৬ বছর বয়সে থার্ড চয়েস হিসেবে সিনিয়র টিমে ইনক্লুড করেন! কেনি'র বাবা একটু দুঃশ্চিন্তায় ছিলেন এ নিয়ে। তবে তিনিও রাজী হোন। টুনার্মেন্টের শুরুতে মেইন গোলকিপার মারিলা ইঞ্জুরিতে বেশ কয়েক মাসের জন্যে ছিটকে পড়েন। পরের এক ম্যাচে সেকেন্ড চয়েস গোলকিপার কে উঠিয়ে রজারিওকে মাঠে নামান কোচ, সেদিন রজারিও অসাধারণ পারফর্ম করে কোচের মন জিতে নেন! সে ম্যাচে একটি পেনাল্টি সেইভ করেন রজারিও! এরপরে কয়েকম্যাচ শুরুর একাদশে ছিলেন রজারিও!

এরপরে ১৯৮২ ব্রাজিল দলের কোচ সান্তানার হাত ধরে সাও পাওলো তে আসেন রজারিও! মুলত সাও পাওলোতে তিনি অ-২০ ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রামে যুক্ত হোন!

সাও পাওলো ক্যারিয়ারের শুরুতেও তিনি সেকেন্ড চয়েস ছিলেন; কিন্তু মাত্র ২০ বছর বয়সে কার দুর্ঘটনায় প্রথম চয়েস গোলকিপার আলেকজান্ডার মারা গেলে রজারিওই হয়ে ওঠেন দলের মুল গোলকিপার!

অ-২০ টুনার্মেন্টে দারুণ শুরু করে রজারিও জায়গা পান সাও পাওলো মুল দলে। সে বছরেই বার্সেলোনাকে হারিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জিতে সাও পাওলো, পরের বছরেও এসি মিলান কে হারিয়ে আবারো চ্যাম্পিয়ন হয় সাও পাওলো! পরের তিন বছর তো ছিলো স্বপ্নের মতো, রজারিও ম্যাজিকে টানা ৩ বার ব্রাজিলিয়ান লীগের শ্রেষ্ঠত্ব পায় সাও পাওলো!

এ বছরেই ব্রাজিল জাতীয় দলে জায়গা পান রজারিও কেনি! ১৯৯৭ কনফেডারেশন কাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি! দিদা'র কারণে কখনোই ব্রাজিল দলে জায়গা পাঁকা হয়নি কেনি'র!

১৯৯৮ এর শুরুতে সাও পাওলোর নতুন কোচ রামালহো ট্রেনিংয়ে লক্ষ্য করলেন, কেনি'র শ্যুটিং এবিলিটি অসাধারণ। রামালহা যেনো নিখাঁদ স্বর্ণ চিনতে ভুল করেননি; কেনো জানি, তিনি কেনি'কে দলের প্রধাণ ফ্রিকিক টেকার হিসেবে বাছাই করেন! কে জানতো, রামালহা'র এই সিদ্ধান্তই একদিন রজারিওকে অনন্য এক উচ্চতায় পৌছে দিবে! রজারিও উনার এক লেখায় বলেন - কোচ টানা ৬ মাস তাকে কিক প্র‍্যাক্টিস করান, এবং শেষমেশ তিনি তার সিদ্ধান্তে উপনীত হোন! ঐ ৬ মাসে, কোচ ১৫ হাজারের উপরে কিক নেওয়ান রজারিওকে!

কোচ রামালহা'র এই অবিশ্বাস্য এবং রিস্কি এই সিদ্ধান্তই পাল্টে দেয় রজারিও'র ক্যারিয়ার! তিনি এখন কেবল গোলকিপারই নন, বরং দলের মেইন ফ্রিকিক টেকার!

সাও জোয়াও'র বিপক্ষে অসাধারণ এক গোল করে রজারিও'র গোলের খাতা খুলে, আর যার শেষ হয় ১৩২ তম পৃষ্ঠায় গিয়ে!

দূরপাল্লার দ্রুতগতির গোল, গোলকিপার হিসেবে হ্যাট্রিক, কর্নার থেকে ডিরেক্ট গোল, ওপেন প্লে থেকে গোল, অসংখ্য চমকপ্রদ রেকর্ড মানুষটির নামের পাশে!

 

২০১৫ সালে গ্লাভস ছাড়লেও ফুটবলের সাথেই আছেন এই বিষ্ময় পুরুষ,  ২০১৬ সালে ব্রাজিলের গোলকিপার কোচের দায়িত্বে ছিলেন।  এর মাঝে সাও পাওলোতেও ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর ফোর্তালেজাতেও কোচিং করিয়েছেন কিছুদিন!

একজন গোলকিপার হয়েও শতগোলের উপরে গোলের চেয়েও ব্রাজিলবাসীর কাছে তিনি প্রিয় একজন বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে! খেলোয়াড়ি জীবনে আর্সেনাল, ইউনাইটেড, মিলান থেকে প্রস্তাব পেয়েছেন, কিন্তু সাও পাওলো'র ভালোবাসা তাকে গেঁথে রেখেছে সাও পাওলোর গোলবারের নিচে! ব্রাজিলবাসীর কাছে লয়্যালিটির আরেক নাম রজারিও কেনি!

রজারিও কেনি এক বিষ্ময়ের নাম, রজারিও কেনি ফ্রিক কিক থেকে অসাধারণ সব গোলদাতার নাম, রজারিও কেনি এক ডেডিকেশনের নাম, রজারিও কেনি এক ভালোবাসার নাম! ব্রাজিলের ফুটবল ঐতিহ্যে জাতীয় দলের ভুমিকায় খেলোয়াড়দের মর্যাদা দেওয়া হয়, সেখানে রজারিও ব্যাতিক্রম, যিনি তার অসাধারণ ক্লাব ক্যারিয়ার দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন লিজেন্ড'দের কাতারে!

রজারিও কেবল এক অনন্য রেকর্ডধারী মানবই নন, বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ঘেরা ব্রাজিলের অর্জন বা প্রাপ্তির ভান্ডারে এক পশলা সৌন্দর্য!

 

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।