• ফুটবল

"দ্যা নেইম ইজ মিলান, এসি মিলান"

পোস্টটি ১৫২১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ডেভিড কালাব্রিয়া, এলেসিও রোমানগোলি, লিও দুয়ার্তে, লুকাস পাকেতা, রাফায়েল লিয়াও - নাম গুলো কি চিনতে পারেন?
না চিনলে সমস্যা নাই। যদি বলি এই নাম গুলো এসি মিলান টিমের বর্তমান লাইন আপের কয়েকজন খেলোয়াড়ের নাম, তাহলে আপনি কিছুটা হলেও দ্বিধায় পরতে বাধ্য।

অথচ এক সময় এই এসি মিলানের গোলবারে দাঁড়াত দিদা। প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলানোর দায়িত্ব ছিলো কাফু, আলেসান্দ্রো নেস্তা, জিয়ানলুকা জামব্রোত্তা আর কিংবদন্তী পাওলো মালদিনির। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করতো ক্লরেন্স সিডর্ফ, জেনারো গাত্তুসো, আম্রোসিনি। আর তাদের এক সুতোয় বেঁধে রাখার দায়িত্ব ছিলো আন্দ্রে পিরলোর। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স গুড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব ছিলো কাকা, শেভচেঙ্কো আর ফিলিপ্প ইনজাঘির।

১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটি প্রথম লীগ শিরোপা জয় করে ১৯০১ সালে। ১৯০৬ ও ১৯০৭ সালে পরপর লীগ শিরোপা জয়ের পরের বছরে বিদেশী খেলোয়াড় সাইন করা নিয়ে ক্লাবে অভ্যন্তরীণ বিভেদ তৈরি হয়। যার ফলে প্রতিষ্ঠিত হয় একই শহরের আরেক মিলান, ইন্টার মিলান। ক্লাবের এই বিভেদের ফলে এসি মিলান ১৯৫০-৫১ মৌসুম পর্যন্ত আর কোনও লীগ শিরোপা জিততে পারেনি। পরের এক দশকে ৫ বার "স্কুডেট্টো" জিতে নেয় এসি মিলান। বলা যায় তখন থেকেই "রোজোনেরি" দের উত্থান শুরু। এরই মাঝে ১৯৬৩ সালে জিতে নেয় তাদের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত আরো ২ টি স্কুডেট্টো আর ১ টি চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা ঘরে তোলে এসি মিলান। কিন্তু ম্যাচ ফিক্সিং এর অভিযোগে ১৯৮০-৮১ মৌসুমে তাদের সিরি বি তে অবনমন ঘটে। অতঃপর সিরি বি তে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ১৯৮৩-৮৪ মৌসুমে পুনরায় সিরি আ তে ফিরে আসে।

ইটালি তথা ইউরোপীয় ফূটবলে এসি মিলানের উত্থানে অন্যতম ভূমিকা রাখেন ইটালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনি। ১৯৮৬ সালে ক্লাবের মালিকানা কিনে নেয়ার পরেই দেদার টাকা খরচ করে ক্লাব কে ঢেলে সাজান। ম্যানেজার হিসাবে নিয়ে আসেন "দ্যা গ্রেট" আরিগো সাচ্চি কে। ডাচ কিংবদন্তি রুড গুলিত, মার্কো ফন বাস্তেন আর ফ্রাংক রাইকার্ড কে এসি মিলান সাইন করান। তাদের সাথে ছিলেন পাওলো মালদিনি, রবার্তো ডোনাডুনি, ফ্রাংকো বারেসির মতো তারকারা। নয় বছর পর ঘরোয়া লীগ জিতে নেয় এসি মিলান। আরিগো সাচ্চির সময়েই এসি মিলান "দ্যা গ্রেটেস্ট মিলান টিম" উপাধি পায়। সেই দলের ডিফেন্সে ছিলেন ফ্রাংকো বারেসি, পাওলো মালদিনি, আলেসান্দ্রো কোস্টাকুর্তা। মাঝ মাঠে ছিলেন ফ্রাংক রাইকার্ড আর কার্লো আনচেলত্তি। ফরোয়ার্ড লাইন সামলাতেন রুড গুলিত আর ডোনাডুনি। আর স্ট্রাইকার হিসাবে ছিলেন মার্কো ফন বাস্তেন। টানা ৩ টি লীগ শিরোপার সাথে ব্যাক টু ব্যাক চ্যাম্পিয়নস লীগ জিতে নেয় এসি মিলান। সাচ্চির সেই এসি মিলান এতোটাই মোহনিয় ফুটবল খেলতো যে কোনও এক ম্যাচে নাপোলি দলের দর্শকরা হেরে যাওয়ার পরও মিলান দলকে স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিয়েছিলো। ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিন এই এসি মিলান কে সর্বকালের সেরা দল হিসাবে আখ্যা দেয়।

পরবর্তী দেড় দশক এসি মিলান ইউরোপীয় ফুটবলে দাপটের সাথে পদচারণ করে। সাচ্চির পর কোচ হয়ে আসেন ফ্যাবিও ক্যাপেলো। তার সময়ে মিলান টানা তিনটি লীগ শিরোপার সাথে ১৯৯৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লীগ টাও জিতে নেয়, যার ফাইনালে ফেভারিট বার্সেলোনা কে ৪-০ গোলে হারায়। আর রোজানেরি রা এই সময়ে টানা ৫৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়ে।

মিলানের পরবর্তী সাফল্যময় বছর গুলো আসে আরিগো সাচ্চির শিষ্য কার্লো আনচেলত্তির কোচিংয়ে। ২০০১ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর মিলান কে ২০০৩, ২০০৫ ও ২০০৭ সালের চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনালে নিয়ে যান। যার মধ্যে '০৩ ও '০৭ সালের চ্যাম্পিয়নস লীগ ঘরে তোলেন। সাথে ছিলো ২০০৩-০৪ মৌসুমের সিরি আ শিরোপা। সেই সময়ে এসি মিলান ছিলো তারকায় ঢাসা এক দল। কাফু, নেস্তা, পিরলো, কাকা, গাত্তুসো, শেভচেঙ্কো, সিডর্ফ, জামব্রোত্তা, ইনজাগি, জিলার্দিনোর মতো প্লেয়াররা ছিলো মিলানের লাইন আপে। পরবর্তীতে রবিনহো, আলেকজান্দ্রার পাতো, ইব্রাহিমোভিচ, রোনালদিনহো, রোনাল্ডোর মতো তারকারাও মিলান কে আলোকিত করেছেন।

অনেক কিংবদন্তী কোচ যেমন এসি মিলান কে সামলেছেন, অনেকে কোচ এসি মিলানে কোচিং করিয়ে কিংবদন্তী হয়েছেন। আরিগো সাচ্চির কথা তো আগেই বলেছি। সিজার মালদিনি, জিওভান্নি ত্রাপাত্তোনি, ফ্যাবিও ক্যাপেলো, মাসিমিলানো এলেগ্রির মতো কোচরা এসি মিলানে সফল সময় কাটিয়েছেন। মিলানের সাবেক তারকা ফ্রাংক রাইকার্ড বার্সেলোনাকে নতুন বার্সেলোনায় পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছেন।

২০১০-১১ মৌসুমের পর থেকে এসি মিলানের পারফরমেন্স খারাপ হতে শুরু করে। ক্লাব কে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকে অনেকে এর জন্য দায়ী করেন। পুরনো অনেক প্লেয়ারের দল ত্যাগ, নতুন প্লেয়ার দের দলে না আনতে পারা, বয়স্ক প্লেয়ার দের সাইন করানো - নানামুখী কারণে এসি মিলান তাদের রং হারাতে শুরু করে। বিশ্বের সেরা প্লেয়াররা এক সময় যে ক্লাবে খেলার স্বপ্ন দেখতেন, সেই ক্লাব এখন নিজেদের ঘরোয়া লীগে প্রথম চারে থাকতেই হিমশিম খায়।

এই প্রজন্মের অনেকেই এসি মিলান নামটি চিনতে পারে না। বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ নিয়েই তারা বুঁদ হয়ে থাকে। অথচ একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে এই এসি মিলানের সুন্দর ফুটবল দেখে, দেখেছে লাল-কালো জার্সির আভিজাত্য। ফুটবল রোমান্টিক দের কাছে এসি মিলান ছিলো এক স্বপ্নের দল। যে দলের প্রতিটি পজিশনে ছিলো একেকজন কিংবদন্তী প্লেয়ার। ইটালির ২০০৬ বিশ্বকাপ জয়ের পুরোধা হয়ে ছিলেন এসি মিলানের পিরলো, গাত্তুসো, জামব্রোত্তা আর জিলার্দিনো। সেই এসি মিলানের সাম্প্রতিক অবস্থা দেখে ফুটবল ভক্তদের দীর্ঘশ্বাস ছাড়া স্বাভাবিক।

এসি মিলান আবারো এসি মিলান হয়ে ফিরবে। সান সিরো স্টেডিয়াম আবারো বিশ্বের সেরা প্লেয়ারদের পদচারণায় মূখর হবে। লাল-কালো জার্সি আবারো ফুটবল রোমান্টিকদের আলোড়িত করবে- সেই দিনের অপেক্ষায় থাকলাম।