• ক্রিকেট

খোলা চিঠি স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের কাছে!

পোস্টটি ১০৮৬ বার পঠিত হয়েছে

প্রিয় পার্শ্বনায়ক,

সহমর্মিতা শব্দটি প্রয়োগ করলে আপনাকে অসম্মান করা হবে,তার চেয়ে সাধুবাদ লিখি।ক্রিকেট খেলায় ভাগ্যও লাগে,সেই পরশ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেই বোধহয় আনসাং হিরো হিসেবে আপনাকে স্মরণ করা হয়।আনসাং বোলারের তালিকা করলে বোধহয় সর্বকালের সাপেক্ষেই আপনি শীর্ষে থাকবেন।স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল(Stuart MacGill),একজন অসাধারণ লেগ স্পিনার।কিছুটা করুণা হয় আপনার জন্য।কারণ আপনার মত আনসাং হিরো দ্রাবিড় বা চন্দরপাল শচীন বা লারার কারণে আলোচনায় আসতে না পারলেও অন্তত দলে নিয়মিত সুযোগ পেয়েছেন।আপনার মত এমন দূর্ভাগা ক্রিকেটার আর কজন আছে বলুন,শেন ওয়ার্নের কারণে নিয়মিত খেলারই সুযোগ পেলেন না।

শেন ওয়ার্নের অভিষেক ১৯৯১-৯২ মৌসুমে আর আপনার ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে।ততদিনের ওয়ার্ন ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে থাকায় রীতিমত ব্রান্ড এ পরিণিত হয়েছেন।শুনেছি বাবাকে দেখে লেগস্পিন এর প্রেমে পড়েন আপনি। বাবার হাত ধরেই তার খেলা ক্লাব শেফিল্ড শিল্ড এ আসেন ১৯৯৩-৯৪ তে।১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে শেফিল্ড শিল্ড এ ২৪.১৮ গড়ে ৩৫ উইকেট শিকার কয়ার পুরষ্কার স্বরূপ ডাক পান দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঘোষিত টেস্ট সিরিজ দলে।দুর্দান্ত গুগলিতে ক্যারিয়ারের ১ম উইকেট নেন জ্যাক ক্যালিসের।সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার ক্যালিস কি তা মনে রেখেছে? দুই ইনিংস এ নিয়েছিলেন ৫ উইকেট আর ওয়ার্ন ৩ উইকেট। একই বছর অক্টোবর এ পাকিস্তান সিরিজে ক্যারিয়ারের ১ম ৫ উইকেট সহ ১৫ উইকেট নিয়ে হন সিরিজের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। সেই দূর্দান্ত ফর্ম অ্যাশেজ এ কাজে লাগিয়ে ৪ টেস্ট এ মাত্র ১৭ গড়ে নেন ২৭ উইকেট আর অজিরা সিরিজ জিতে ৩-১ ব্যাবধানে।সতীর্থদের কাছে পরিচিত হয়ে পড়েন "ম্যাগিলা গরিলা" নামে।

WhatsApp Image 2020-03-13 at 8.23.37 AM

১৯ জানুয়ারি ২০০০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হলেও দূর্ভাগ্যকে সঙ্গী করে আপনি খেলেছেন মাত্র ৩ ওয়ানডে।তার মধ্যে পাকিস্তানের সাথে সিডনিতে ১০ ওভারে ১৯ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়ে হয়েছেন ম্যান অব দ্যা ম্যাচ।৩ ম্যাচে ৬ উইকেট আর ইকোনমি মাত্র ৩.৫।পরবর্তী উইন্ডিস সিরিজে ৪ টেস্ট ও মাত্র ১২ উইকেট নিয়ে নির্বাচকদের হতাশ করার পর অনিয়মিত হয়ে পড়েন।

দেড় বছর পর আবার উইন্ডিজের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ফিরে এসেই নেন ১০৪ রানে ৭ উইকেট। ২০০১ এ অ্যাশেজের দলে থেকেও মাঠে নামতে না পারলেও ২০০২ এ আফ্রিকানদের সাথে টেস্ট এ ৮ উইকেট নিয়ে ম্যাচ জেতান।২০০৩ সালে ডোপ কেলেঙ্কারি দায়ে ওয়ার্ন সাময়িক নিষিদ্ধ হলে কপাল খুলে আপনার।সে বছর উইন্ডিজ,বাংলাদেশ,জিম্বাবুয়ে ও ভারতের বিপক্ষে মূল স্পিনার হিসেবে খেলেন। ওয়ার্নার ফেরার আগ পর্যন্ত ১১ টেস্টে নেন ৫৩ উইকেট।

ওয়ার্ন ফেরার পরবর্তী ২ ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়ে আবার বাদ পড়েন।এক বছর পর ফিরে ২০০৫ এ পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই ইনিংসে ৮ উইকেট নিয়ে হন ম্যাচসেরা।সেবছর আইসিসি বিশ্বএকাদশের বিপক্ষে ২ ইনিংস মিলিয়ে নেন ৯ উইকেট।২১০ রানে জিতে অজিরা।

২০০৬ সালে বাংলাদেশে আসা অস্ট্রেলিয়া দলটিতে ছিল দুজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ছিলেন আপনি ও ওয়ার্ন।ফতুল্লা টেস্ট এ ১ম ইনিংসে পাওয়া ১০৮ রানে ৮ উইকেটের স্পেলটি আপনার ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ফিগার।দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজে নেন ১৬ উইকেট। এই সফরে দূর্দান্ত পারফর্ম করেও দেড় বছর কাটান সাইড বেঞ্চে।২০০৭ সাথে ওয়ার্ন অবসর নিলে তার পর আপনি মাত্র ৪ টি টেস্ট খেলেন।ততদিনে বোলিং এ অস্ত্রের ধারযে কমে গিয়েছিল।শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টে অংশ নেন। ২০০৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন আপনি।

প্রায় দশ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে টেস্ট খেলেছেন মাত্র ৪৪ টা। এই ৪৪ টেস্টেই নিয়েছেন ২৯.০২ গড়ে ২০৮ উইকেট, স্ট্রাইক রেট ৫৪.০। ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছেন ১২ বার এবং এক ম্যাচে ১০ কিংবা তার বেশি উইকেট নিয়েছেন ২ বার।ঘরোয়া ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটে ১৮৪ ম্যাচে নেন ৭৭৪ উইকেট!ভাবা যায়?

কখনো দেখা হলে প্রশ্ন করতাম,এসব পরিসংখ্যান দেখে কি আফসোস হয় আপনার?একটু কি হিংসে হয়না শেন ওয়ার্নের প্রতি?অন্য যেকোন দেশের হয়ে খেললে আপনি হতেন তাদের তুরুপের তাস,কিন্তু স্বয়ং ওয়ার্নের সাথে জায়গা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার অবকাশ তৈরি হলে বাইরে বসে থাকাই একমাত্র পরিণতি।অবশ্য ওয়ার্ন আর আপনি দুজনেই খেলেছেন এমন ম্যাচগুলোতে ওয়ার্নের চাইতে আপনার পারফরমেন্স বরং কিছুটা এগিয়ে ছিল।ওয়ার্নের তুলনায় শূন্যে বল কিছুটা ধীরগতিতে ফেললেও বল নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘুরাতে পারতেন।তবু নির্বাচকরা ওয়ার্নের ওপরই আস্থা রেখেছিলেন।কারণ আগেই উল্লেখ করেছি,ওয়ার্ন নামটা ততোদিনে একটা ব্রান্ড এ পরিণত হয়েছিল।একই বল আপনি ডেলিভারি দিলে সেটার প্রভাব,আর তার চাইতে খারাপ একটি বল ওয়ার্ন ডেলিভারি দিলে ব্যাটসম্যানের মাইন্ডসেটে দুরকম প্রভাব পড়তো।ক্রিকেট তো একটা মানসিক খেলাই,সেটা আপনারা অস্ট্রেলিয়ানরা যতো ভাল বুঝেন,অন্যরা ত বুঝেই না।সমবেদনা যদি কাউকে জানাতেই হয় সেটা আপনার মা-বাবাকে। তারা যদি অস্ট্রেলিয়ার বদলে ইংল্যান্ড বা প্রতিবেশী দেশ নিউজিল্যান্ড এ আবাসন নিতেন,তাহলে নিশ্চিতভাবেই স্পিন কিংবদন্তী হিসেবে স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল নামটা জ্বলজ্বল করত।সেটা যে হয়নি, এটা একা আপনার ক্ষতি নয়,ক্রিকেট খেলাটাই একজন স্পিন প্রোডিজির বোলিং থেকে বঞ্চিত হয়েছে,দর্শক মিস করেছে বিভ্রান্তিকর সব গুগলি আর ফ্লিপার।তাই আপনি যতটা হতাশ,আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যদি অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ হতো,হতাশায় সে মুষড়েই পড়ত।আমরা বরং শেফিল্ড শিল্ড লীগের দর্শকদের ভাগ্যবান বলতে পারি,যারা ঘরোয়া ম্যাচসূত্রে হলেও নিয়মিত আপনাকে হাত ঘুরাতে দেখেছেন।

চিঠি শেষ করবো।আপনাকে যা বলার বলে দিয়েছি,নতুন কিছু লেখার নেই।শুধু এটুকুই বলতে পারি,আপনাকে মিস করছি।

অবসয় সুন্দর কাটুক।

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।