• ক্রিকেট

লর্ডসের সেই তামিম

পোস্টটি ১৮৩৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

'আচ্ছা অনার্স বোর্ডে শুধু সেঞ্চুরিয়ানদের নাম লেখা হয় কেন? ফিফটির জন্যেও আলাদা জায়গা রাখা উচিত।' ২১ বছর বয়সী তামিম ইকবালের করা প্রশ্নে লর্ডসের অ্যাটেনডেন্টের সোজা জবাব, '‘অনার্স বোর্ডে নাম লেখাতে সেঞ্চুরিই লাগবে।’ তামিম বললেন, ‘আচ্ছা, তা-ই হবে। সেঞ্চুরি না করে আমি এখান থেকে যাচ্ছি না।’

ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক ভাবে লর্ডসের অভিষেক ১৮৮৪ সালে। ব্যাট-বলের খেলাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়া মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) কাছেই মাঠটির দায়িত্ব। যে কারণে হয়তো লর্ডসকে বলা হয়ে থাকে ক্রিকেটের তীর্থভূমি। এখানে টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি কিংবা ৫ উইকেট পেলেই নাম ওঠে যায় অনার্স বোর্ড নামক ইতিহাসে। তাই প্রতিটি ক্রিকেটারের কাছেই লর্ডস মানে বিশেষ কিছু।

লর্ডসের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম পরিচয় ২০০৫ সালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের ১ম টেস্টে সেবার ভরাডুবির শিকার হতে হয়েছিল। দুইবার ব্যাটিং করে সেঞ্চুরি ত দূর পঞ্চাশও পেরোতে পারেননি কোনো ব্যাটসম্যান। অপরদিকে বোলারদের অবস্থা আরো খারাপ। সর্বসাকুল্যে ৩ জন ইংলিশ ব্যাটসম্যানকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখাতে পেরেছেন। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় দ্বিতীয়বার আর মাঠে নামতে হয়নি তাদের।

117750

ঠিক ৫ বছর পর আবারো লর্ডসের সঙ্গে দেখা বাংলাদেশের। এবারের দলটা আগের তুলনায় খানিকটা পরিপূর্ণ বলা যায়। কয়েক মাস আগেই ঘরের মাটিতে ইংলিশদের বিপক্ষে লড়াই করার পরিচয় দিয়ে এসেছে তারা। যার অগ্রসৈনিক ছিলেন তামিম ইকবাল। দুই টেস্টের চার ইনিংসের মধ্যে তিনটিতেই ফিফটি আছে তার। বড় ভাই নাফিস ইকবালের কাছ থেকে শুনেছেন লর্ডসে সেঞ্চুরি করলে একটা বোর্ডে নাম ওঠানো হয়। তামিমের স্বপ্নের শুরুটাও সেখান থেকে। অনুশীলনের সময় হাতের ইনজুরিতে পরলেও লর্ডসে খেলার সুযোগ হারাতে চাননা বলেই কোচ ও অধিনায়ককে এক প্রকার জোর করেই নিজেকে একাদশে রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

টস জিতে টাইগার অধিনায়ক সাকিব আল হাসান আগে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলে দীর্ঘ হয় অপেক্ষা। দেড় দিন ব্যাট করে ৫০৫ রানে ইংল্যান্ড অলআউট হওয়ার পর নামার সুযোগ পান। ওহ-হ্যাঁ, তার আগে বোলিংয়ে ৫ উইকেট নিয়ে প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে অনার্স বোর্ডে নাম লিখিয়েছেন শাহাদাত হোসেন। বোলিংয়ে পারদর্শী নন বলেই খুব একটা আফসোস হচ্ছে না। তবে ব্যাট হাতে প্রথম হওয়ার সুযোগটা অবশ্যই রয়েছে।

সাত সমুদ্র পার হয়েও তামিমের ব্যাটে কোনো ভাটার চিহ্ন দেখা যায়নি। ভিন্ন কন্ডিশনে ছড়িয়ে যাচ্ছেন একের পর এক স্ট্রোকের ফুলঝুড়ি। টেস্ট ম্যাচে ওয়ানডে মেজাজের স্বাদ দিয়ে মাত্র ৫৯ বলেই স্পর্শ করেন ফিফটি। কিন্তু বিধিবাম! কেভিন পিটারসেনের দুর্দান্ত এক থ্রোতে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে রান আউটের শিকার হন তামিম। ৮ চারে ৫৫ রানের বিদায় নেয়ার পথে ড্রেসিংরুমেই অ্যাটেনডেন্টের বললেন, ফিফটির জন্য আলাদা তালিকা করতে।

tamim

এদিকে ইংলিশদের স্বভাবচুত নাকউচু ভঙ্গিমায় সাবেক ক্রিকেটার জিওফ বয়কট বলে ওঠলেন, বাংলাদেশ টেস্ট খেলারই যোগ্য না। এমন কথা শুনে মেজাজটা বিগড়ে গেল তামিমের। তার মতো কিংবদন্তির কাছ থেকে নিজ দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনবেন তেমনটা আশা করেননি তিনি। বাংলাদেশ এতোটাই খারাপ খেলছে না যে, টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নেয়া উচিত। তবে মুখের বুলিতে ত আর বয়কটের মন গলাতে পারবেন না তামিম। তাই ঠিক করে নিলেন জবাবটা মাঠেই দেয়ার।

উড়ন্ত সুচনার পরেও ফলোঅনে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। যার ফলে টানা ব্যাটিংয়ে নামার সুযোগ পান তামিম। অপর দিকে উকি দিচ্ছে ইনিংস হারের স্বাদ। আগের মতো আক্রমনাত্মক না হয়ে এবার স্ট্রাইক কম নিয়ে খেলতে থাকেন তামিম। তাই রানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে যান ইমরুল কায়েসের থেকে। তবে ৩৭ রানের পর পূর্ণরূপে ফিরে আসেন তিনি। ২০ তম ওভারে স্টিভেন ফিন পরপর তিনটি চার মেরে স্পর্শ করেন ফিফটি। পরের ওভারে গ্রায়েম সোয়ান এক চার ও দুই ছক্কা মেরে তুলে নেন ১৭ রান।

তখনই বোঝা গিয়েছিলো সেঞ্চুরি আজ করেই ছাড়বেন তামিম। ৮৭ রানের পর তিন অঙ্কে পৌছাতে সময় নেন মাত্র ৪ বল। টিম ব্রেসনানকে লং অন দিয়ে উড়িয়ে মারার পর তামিমের নজর সেই অ্যাটেনডেন্টের দিকে। হাওয়ায় ভেসে সেঞ্চুরি উদযাপন করে তাকে পিঠ দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, 'নাও এবার লিখে রাখো আমার নাম।' ৯৪ বলে ১০০ রান সেসময় বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্রুততম সেঞ্চুরি ত বটেই, গত ২০ বছরে লর্ডসের ইতিহাসেও দ্রুততম সেঞ্চুরি। তামিমের থেকে ৭টি বল কম খেলে সে রেকর্ড দখলে ছিলো ভারতীয় সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দীনের। এখন অবশ্য তা বেন স্টোকসের দখলে (৮৫ বলে)।

236339

সেঞ্চুরির পর তামিম টিকেন আর মাত্র ৬ বল। স্টিফেন ফিনের বলে ডিপ ফাইন লেগে দাঁড়িয়ে থাকা জোনাথন ট্রটের ক্যাচে পরিণত হয়ে বিদায় নেন ১৫ চার ও ২ ছয়ে ১০৩ রান করে। তামিমের এই ইনিংস বদলে দেয় বাংলাদেশের চিত্র। দেশীয় গণমাধ্যম ত বটেই, পরের দিন বড় বড় ইংলিশ পত্রিকাগুলোও মুখরিত ছিলো তামিম বন্দনায়। এক সেঞ্চুরিতেই দাত ভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন বয়কটকে। যার ফলে কথার সুর ঘোরাতে বাধ্য হন সাবেক এই ইংলিশ ক্রিকেটার, 'আমি মূলত বাংলাদেশের বোলিংয়ের কথাই বলেছি। এই বোলিং বড়জোর মাইনর কাউন্টি মানের হতে পারে। তবে তামিম ইকবাল অসাধারণ ব্যাটিং করেছে। তার ইনিংসটা বিশেষ কিছু।'

লর্ডসে সেঞ্চুরি আছে অনেক রথী-মহারথীদের। কিন্তু কেউই তামিমের মতো বলে কয়ে সেঞ্চুরি করতে পারেননি! স্বীকার করলেন ওই অ্যাটেনডেন্ট, 'এভাবে কাউকে বলে-কয়ে সেঞ্চুরি করতে দেখিনি। তুমিই প্রথম!' নান্দনিক এক ইনিংস খেলেও আউট হওয়ার ধরণ নিয়ে সমালোচনার খোড়াক জুগিয়েছিলেন তামিম। এর জবাবে তিনি বলেন, 'আমি যেরকম ওরকমই খেলব। পরের টেস্টে হয়তো এভাবে খেলতে গিয়ে প্রথম বলে, আউট হয়ে যাব। তাতে আমার কোনো দুঃখ থাকবে না। কারণ আমি জানি রান করলে এভাবে ব্যাটিং করেই করবো। আমি জাতীয় দলে এসেছিও ত এই ব্যাটিংয়ের জন্যে।'

এবার একটু মিলিয়ে দেখুন তো, ১০ বছর আগে তামিমের ঐ কথার সঙ্গে আজকের তামিমের মিল খুজে পান কি না?