• ক্রিকেট

৮০০ঃ রাইজ অব আ ম্যাজিশিয়ান

পোস্টটি ৩৮৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

৪৯০ বিসিতে পার্সিয়ানরা ম্যারাথন যুদ্ধে ২৫০০০০ হাজার সৈন্য নিয়ে গ্রীক বীর মাল্টিয়াডিসের হাতে এর কাছে মারা পড়েন। আর এই পরাজয় পারস্য সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট দারিয়ুসের পক্ষে ব্যাপক অপমানজনক ছিলো। দারিয়ুস তার জীবদ্দশায় এথেন্স জয় করতে পারেনি৷ তিনি তার মৃত্যুশয্যায় ছেলে জারক্সিসকে এথেন্সের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বলে যান। 

দারিয়ুসের মৃত্যুর পর ছেলে জারক্সিস প্রায় ৫ লক্ষেরও বেশি সৈন্য নিয়ে ম্যারাথন যুদ্ধের ১০ বছর পর গ্রীস তথা পুরো ইউরোপে আক্রমণ চালায়। আর এই সময়টাকেই বলা হয় ৩০০ খ্যাত থার্মোপলির যুদ্ধের ইতিহাস। কিন্তু আমার আজকের গল্প কোনো যুদ্ধ বিগ্রহ, রাজ্য দখল নিয়ে না। আজকে আমার ছোট গল্পটা হলো টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলারের, নিজের সর্বোচ্চ পর্যায় দখলের, স্পিনারদের রাজা হওয়ার ।

বয়স তখন ১৪, কোচ সুনীল ফার্নান্দোর পরামর্শে অফ স্পিনার হিসেবে নিজেকে তৈরী শুরু করেন তিনি। স্কুল শেষে যোগ দেন তামিল ইউনিয়ন ক্লাবে। ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম রিস্ট স্পিনিং অফ স্পিনার তিনি। যার ফলে খুব তাড়াতাড়িই শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দল নির্বাচকদের নজরে আসেন। রিস্ট স্পিনাররা সাধারণত লেগ স্পিনার হয়ে থাকেন কিন্তু এই জায়গায় এই মানুষটা সম্পূর্ণ বিপরীত। অফ ব্রেক এর সাথে টপ স্পিন, দুসরা আর রিস্ট স্পিনিং একশন মিলিয়ে এক রহস্যময় বোলারে পরিণত হন তিনি।

২৮ আগস্ট, ১৯৯২। কলম্বো, বিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। অভিষেক হয় এক বোলারের, নাম মুত্তিয়া মুরালিধরন। অভিষেকে খুব ভালো কিছু করতে পারেন নি তিনি। পুরো ম্যাচে নিয়েছেন তিন উইকেট। ১৯৯৫; নেপিয়ার টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৪ রানে পাঁচ উইকেট নেন তিনি। এই ম্যাচের পর লঙ্কার ম্যানেজার দুলিপ ম্যান্ডিস বলেন, " মুরালির যা প্রতিভা তাতে সে কংক্রিটের পিচেও টার্ন করাতে সক্ষম।"

সেদিন মেলবোর্নে বক্সিং ডে টেস্টে ৬০০০০ হাজারের অধিক দর্শকের সামনে নিজের প্রথম বাধার মুখোমুখি হন তিনি। আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার চাকিংয়ের দায়ে সাত বার নো বল কল করেন। এক পর্যায়ে বাধ্যহয়ে রানাতুঙ্গা হেয়ার যে প্রান্তে আম্পায়ারিং করছেন সে প্রান্তে আর বোলিংয়ে আনেননি তাকে। ম্যাচ শেষে আম্পায়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালেও আইসিসি সেটিকে খুব একটা আমলে নেননি। এরপর মুরালিধরন নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় বায়োম্যাকানিক্যাল পরিক্ষায় অংশ নেন এবং সেখানে নিজের বোলিং একশনকে বৈধ প্রমাণিত করেন। ১৯৯৭ সালে প্রথম লঙ্কান বোলার হিসেবে টেস্টে ১০০ উইকেট শিকার করেন তিনি ।

আগস্ট ১৯৯৮, বিপক্ষ ইংল্যান্ড। ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই টেস্টে নিজের সবচেয়ে বড় চমক দেখান তিনি৷ দুই ইনিংস মিলিয়ে ইংল্যান্ডের ১৬ উইকেট তুলে নেন একাই। প্রথম ইনিংসে সাত উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে নয় উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডকে একাই ধ্বসিয়ে দেন তিনি। সেই টেস্ট শ্রীলঙ্কা ১০ উইকেটে জয় লাভ করে এবং এটিই ছিলো ব্রিটিশ কলোনিতে প্রথম লঙ্কাবিজয়। ১৯৯৯ জানুয়ারিতে আবার বোলিং একশন বাঁধার মুখে পড়েন তিনি। এবং প্রশ্ন তুলেন আম্পায়ার রয় এমারসন। ফলাফল স্বরুপ আবার বায়োম্যাকানিক্যাল পরীক্ষা করাতে হয় এবং সেখানে ভালভাবেই উতরে যান তিনি।

২০০২, ক্যান্ডি টেস্ট। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই টেস্টে তিনি নিজের সেরা বোলিং করেন। প্রথম ইনিংসেই নিয়ে নেন তাদের ৯ উইকেট, আর খরচ করেন মাত্র ৫১ রান। আর সেই সিরিজেই নিজের ৭২তম ম্যাচে ৪০০ টেস্ট উইকেট এর মালিক হন তিনি। সেবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তিন ম্যাচে নেন ১০ উইকেট এবং সেই আসরের সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহল হন তিনি।

২০০৪; অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে আবারো প্রশ্নবিদ্ধ মুরালিধরন। এইবার তার অস্ত্রভান্ডারের অন্যতম ভয়ানক অস্ত্র 'দুসরা' এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড। এবং তৃতীয় বারের মতো বায়োমেকানিক্যাল টেস্ট করাতে যান তিনি। সেখানে দেখা যায় দুসরা এর সময় তার হাত ১৪ ডিগ্রী বাঁকে কিন্তু তখনকার নিয়ম অনুযায়ী স্পিনাররা সর্বোচ্চ ৫ ডিগ্রী, মিডিয়াম পেসাররা ৭.৫ ডিগ্রী এবং পেসাররা সর্বোচ্চ ১০ডিগ্রী হাত বাঁকাতে পারবে। এই পরীক্ষার পর আইসিসি খেয়াল করে যে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বেশিরভাগ বোলারেরই বোলিং একশজ অবৈধ। ফলে আইসিসি নতুন নিয়ম করে, এবং সকল ধরনের বোলার জন্য ১৫ ডিগ্রী হাত বাঁকানোর অনুমতি দেয়। যার ফলে সেবার মুরালিধরনের বোলিং একশন বৈধতা পায়।

২০০৬, মুরালিধরনের সেরা বছর৷ সে বছর তিনি মোট ১১টি টেস্ট খেলেন এবং নেন ৯০ উইকেট। ট্রেন্ট ব্রিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক টেস্টে ইংল্যান্ডকে চতুর্থ ইনিংসে ৩২৫ রানের টার্গেট দেয় লংকানরা। ট্রেসকোথিক আর স্ট্রস মিলে অসাধারণ এক শুরু করেন, উদ্বোধনী জুটিতে করেন ৮৪ রান। আর এরপরেই শুরু মুরালি শো, ৮৪/০ থেকে ১৯০ রানে অল-আউট ইংল্যান্ড। নিজেই তুলে নেন তাদের ৮ উইকেট।

শেন ওয়ার্ন ততদিনে অবসরে চলে গিয়েছে। মুরালি এর সামনে এবার রেকর্ড করার রাস্তা খোলা। ২০০৭ এর জুলাইয়ে ওয়ার্নের পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ৭০০ উইকেটের মাইলফলক অর্জন করেন তিনি। আবার ডিসেম্বরে ক্যান্ডি টেস্টে পল কলিংউডকে আউট করে ওয়ার্নকে ছাড়িয়ে যান তিনি।

২০১০, গল্পের শেষ অধ্যায়। ম্যাজিক্যাল স্পিন মাস্টার মুরালিধরন ততদিনে এক আতঙ্কের নাম ব্যাটসম্যানদের কাছে। সেবছরের জুলাইয়ে ঘোষণা দেন ভারতের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচ খেলেই অবসরে যাবেন তিনি। পকেটে তখন ৭৯২ উইকেট, বাকী আছে আর এক টেস্ট। এই টেস্টে যদি ৮ উইকেট নিতে পারেন তাহলে ইতিহাসের প্রথম মানুষ হিসেবে ৮০০ টেস্ট উইকেটের মালিক হবেন তিনি। খেলা শুরু কিন্তু দ্বিতীয় দিন বৃষ্টি বাধায় পরিত্যক্ত হয়। শ্রীলঙ্কা ইনিংস শেষ করে ৫২০ রানে। আর এরপর শেষবারের মতো দ্য মুরালি শো। প্রথম ইনিংসেই ৫ উইকেট নিয়ে ভারতকে ফলো অনে পাঠান তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামলো ভারত, মুরালিধরনের দরকার আর তিন উইকেট। সহজ পথ, কিন্তু সে সময় শুরু হলো শ্রীলঙ্কার ওয়ান অব দ্য বেস্ট মালিঙ্গা এর ঝড়। মালিঙ্গার এর বিধ্বংসী বোলিংয়ের সাথে অনেকের কপালেই চিন্তাত ভাঁজ পড়ে যে, মুরালি কি পারবে। ভারতের নয় উইকেট শেষ, হাতে আর এক উইকেট আর মুরালিরও লাগছে এক উইকেট। ব্যাটিংয়ে থাকা প্রজ্ঞান ওঝার ব্যাটের কোনায় লেগে স্লিপে থাকা জয়াবর্ধনের হাতে ক্যাচ আউটের সাথে সাথেই ইতিহাস তৈরি হয়। প্রথম বোলার হিসেবে টেস্টে ৮০০ উইকেট! আর সেটি হয় আজকের দিনেই অর্থাৎ বাইশে জুলাই।

ক্রিকেটে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের বোঝা খুবই মুশকিল। ঠিক তেমনই একজন ছিলেন মুত্তিয়া মুরালিধরন। ওনার বোলিং একশন ধরা একজন ব্যাটসম্যানের কাছে রীতিমতো স্বপ্নের মতো ছিলো। তিনি তার ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ ৮০০ উইকেট নিয়েছেন টেস্টে। এই রেকর্ড কেউ ভাংতে পারবে কি না কেউই জানে না। আর রেকর্ড করতে কম চড়াই উতরাই পার হতে হয়নি ওনাকে। বোলিং একশনের দায়ে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া। নিজেকে প্রমাণিত করে বারবার মাঠে ফিরে এসে ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তুলেছেন নিজের ম্যাজিক্যাল স্পিন দিয়ে৷ ক্রিকেটের এক পূর্ণতার গল্প 'মুত্তিয়া মুরালিধরন'।