• ক্রিকেট

দ্য ম্যান ফ্রম কনকাশন টু সাকসেসন...!

পোস্টটি ৪০২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সেদিন এবটের বলটা হিউজে শরীরে নাও লাগতে পারতো। মাথার পাশ ঘেষে চলে যেতে পারতো পেছনে দাঁড়ানো উইকেট কিপারের হাতের মাঝে। কিন্তু না তা হলো না, বলটা নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করলো তার শরীরে এবং তাকে আমাদের থেকে দূরে পাঠিয়ে দিলো। কে বলতে পারতো সেদিন মাঠে যে এইটা হবে? 

এশেজ ২০১৯ - দ্য লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। সবাই যখন ব্যার্থ তখন অন্যপ্রান্তে নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন স্টিভেন স্মিথ। 

76.2- Jofra Archer to Smith, No run. Woof. That's smashed him right on the side of his head and Smith is down on the floor. 92.4 MPH bouncer. 

মাটিতে শুয়ে পড়েছেন স্মিথ। ইংলিশ প্লেয়াররা এসে পাশে দাঁড়ান, সাহায্য করার চেষ্টা করেন স্মিথকে উঠে দাঁড়ানো। কিন্তু স্মিথ পারছিলেন না। চোখ বন্ধ করে পড়েছিলেন মাটিতে৷ সবাই তখন হয়তো প্রার্থনা করছিলো যেন ফিলিপ হিউজের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। উঠে দাঁড়ালেন তিনি, যাক এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। ফিরে গেলেন প্যাভিলিয়নে। তারপর আবার মাঠে ফিরলের ৯২ রান করে আউট হলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি খেলার জন্য আনফিট। প্রথম ইনিংসে মাথায় চোট আর যেই বলে মাথায় চোট পেয়েছিলেন তার আগেই তিনি আর্চারের আরেক বলে ভয়ংকর চোট পেয়েছিলেন হাতে। দুইটা মিলিয়ে সম্পূর্ণ আনফিট স্মিথ। সুতরাং, দ্বিতীয় ইনিংসে কে খেলবে কনকাশনের নিয়মে? নামলো মার্নাশ লাবুশেইন। আচ্ছা, কনকাশন কি? চলুন জেনে আসি, 

কখন আঘাত পেলে বদলি হিসেবে নামানো যাবে? 

খেলার সময়, এবং খেলার নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সেই ক্রিকেটারকে আঘাত পেতে হবে ঘাড় বা মাথায়- যার ফলে হতে পারে কনকাশন। 

কনকাশন কে নির্ধারণ করবেন? 

দলের মেডিকেল টিম। কোনও ক্রিকেটার কনকাশন টেস্ট উৎরাতে ব্যর্থ হলে ৩৬ ঘন্টার মধ্যে সে রিপোর্ট জমা দিয়ে একজন বদলির আবেদন করতে পারবে কোনও দল। 

বদলি ক্রিকেটারের ভূমিকা কী হবে? 

আইসিসির প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ি, বদলি ক্রিকেটারকে হতে হবে ‘লাইক-টু-লাইক’, অর্থাৎ, ব্যাটসম্যানের বদলে ব্যাটসম্যান, পেসারের বদলে পেসার, স্পিনারের বদলে স্পিনার, অলরাউন্ডারের পরিবর্তে অলরাউন্ডার- এমন। প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী যে কোনও ক্রিকেটার, যিনি ওই দলের হয়ে খেলার যোগ্যতা রাখেন, তিনিই কনকাশন-বদলি হিসেবে নামতে পারবেন। 

কে নামবেন, সেটি কে ঠিক করবে? 

কনকাশন-বদলি হিসেবে একজনের নাম জমা দেবে দলের মেডিক্যাল প্রতিনিধি। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আইসিসির ম্যাচ রেফারি, যার সিদ্ধান্তের কোনও বদল হবে না, কোনও দল আপিলও করতে পারবে না সে সিদ্ধান্তের। 

যদি ‘লাইক-ফর-লাইক’ বদলি না থাকেন? 

এক্ষেত্রে ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেবেন ম্যাচ রেফারি। একজন অলরাউন্ডার একজন ব্যাটসম্যানের বদলি হিসেবে নামতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে সেই অলরাউন্ডার শুধু ব্যাটিং করতে পারবেন- এমন নিয়ম বেঁধে দিতে পারেন ম্যাচ রেফারি। মিরাজের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে- তিনি কলকাতা টেস্টে করবেন শুধু ব্যাটিং আর ফিল্ডিং-ই। আর যে ক্রিকেটারের বদলি নামানো হলো, সে ক্রিকেটার আর ঐ ম্যাচে খেলতে পারবেন না। যেমন লিটন যদি পরদিন ফিট হয়েও থাকেন খেলার জন্য, তিনি আর নামতে পারবেন না। 

একাধিক বদলি ক্রিকেটার নামাতে পারবে দল? 

হ্যাঁ, যদি কনকাশন একাধিক ক্রিকেটার হয়ে থাকে, তাহলে বদলি হিসেবে নামতে পারবেন একাধিক ক্রিকেটার। তবে কনকাশন-বদলি বাধ্যতামূলক নয়। চাইলেই কোনও দল চিরায়ত নিয়মে বদলি ক্রিকেটারকে নামিয়ে শুধু ফিল্ডিং করাতে পারে।

তো সেদিন কনকাশনের নিয়মে নামলেন মার্নাশ লাবুশেন। স্মিথের একদম পারফেক্ট রিপ্লেসমেন্ট৷ অভিষেক হয়েছিলো এর ঠিক দুই বছর আগে। অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে ০ আর দ্বিতীয় ইনিংসে আনলাকি “১৩”। আর প্রথম শ্রেণীর গড় ছিলো চল্লিশের কোটায়ও। কিন্তু কে জানতো লাবুশেনই আজকে স্মিথের এক পারফেক্ট রিপ্লেসমেন্ট হবে। 

১৪ টেস্ট ২৩ ইনিংস ১৪৫৯ রান। এভারেজ ৬৩.৪৩....!!! বিশ্বাস হয়? হ্যাঁ, এইটাই লাবুশেন এর বর্তমান টেস্ট স্ট্যাটস। এশেজের দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামেন তিনি। বিপক্ষ বোলার হিসেবে আছেন আর্চার, ওকস, ব্রড, স্টোক্স এর মতো বোলাররা। নেমেই তিনি পড়েন আর্চারের সামনে, যে কিনা স্মিথকে লাস্ট ইনিংসে আহত করেছিলো। আর্চারের দ্বিতীয় ডেলিভারি গিয়ে লাগে লাবুশেনের হেলমেটের গ্রীলে, হাটু গেড়ে বসে পড়েন তিনি। এ যেন পূর্বের পুনরাবৃত্তি। এরপর উঠে দাঁড়ালেন আর  ৫৯ রান। হোয়াট আ পেব্যাক! 

এরপর তৃতীয় টেস্ট; প্রথম ইনিংসে ৭৪ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৮০। চতুর্থ টেস্ট; স্মিথ ফিরলেন। খাজা চলে গেলেন সাইড বেঞ্চে আর তার জায়গায় লাবুশেন৷ প্রথম ইনিংসেই স্মিথের ২১১ আর লাবুশেন ৬৭;দ্বিতীয় ইনিংসে স্মিথের ৮২ আর লাবুশেনের ১১। হোয়াট আ ব্যাটিং ডুয়ো। বিপক্ষ দলের বোলারদের জন্য রীতিমতো যমদূত। পঞ্চম টেস্টে লাবুশেন অত ভালো খেলতে পারেনি ; প্রথম ইনিংসে ৪৮ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪। চলতি বছর ৩রা জানুয়ারী সিডনিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করেন নিজের হাইয়েস্ট ইনিংস, ২১৫ রান। কনকাশনের নিয়মে বদলি হয়ে নামা লাবুশেন প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন নিজেকে। খেলছেন অসাধারণ সব ইনিংস। 

২২ জুন, ১৯৯৪; দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর পশ্চিম প্রদেশের ক্লার্কসড্রপে জন্মনেন মার্নাশ। তার বয়স যখন ১০ বছর তখন তাকে নিয়ে তার বাবা মা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে তার বাবা খনিজ কারখানায় কাজ করতেন। এবং তাকে ব্রিসবেনের একটি স্কুলে ভর্তি করা। তিনি কুইন্সল্যান্ড এর পক্ষে অনূর্ধ্ব-১৩;১৫;১৭;১৯ খেলেন আর ১২-১৩ মৌসুমে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ অধিনায়কত্ব করেন। 

শুভ জন্মদিন মার্নাশ লাবুশেইন।