• ক্রিকেট

অ্যালিস্টার কুক: একটি বিদায়ী ইনিংস ও একটি মহা কাব্য

পোস্টটি ৪৭২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সময়টা ২০১৮ সাল। ২ সেপ্টম্বর সাউদাম্পটন টেস্টে ভারতকে ৬০ রানে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই পাঁচ ম্যাচের সিরিজ ৩-১ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে ইংল্যান্ড। সিরিজের নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ায় নিয়মরক্ষার শেষ ম্যাচে দল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ছিল স্বাগতিকদের। কিন্তু তখনই এলো এক কঠিন খবর। ক্রিকেট পাড়ায় শুরু হয়েছে আলোচনা। খবর এলো বিদায়ের। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের শেষ ম্যাচটা জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ হিসেবে খেলবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অ্যালিস্টর কুক।
নিজের জীবনের শেষ টেস্ট ম্যাচটা অ্যালিস্টার কুকের জন্য সত্যি একটা মহা কাব্য। শুধু তাঁর জন্য নয়, পুরো ক্রিকেট বিশ্বে এ যেন এক অবিশ্বাস্য এবং কাল্পনিক অধ্যায়। হ্যাঁ, ইংল্যান্ড ক্রিকেটের একটা অধ্যায়ের নাম অ্যালিস্টার কুক। যিনি জীবনের শেষ টেস্টে ইতিহাসের গল্প রচনা করে গেলেন।

ওভালে কুক খেলতে নেমেছিলেন জীবনের শেষ টেস্টের শেষ ইনিংস। প্রথম তিন দিনের কথা স্কিপ করলে বোধহয় সমস্যা নেই। কারণ গল্পটা ৪র্থ দিনেন। ৩য় দিন ৪৬ রান নিয়ে যখন ৪র্থ দিনের ব্যাটিং করতে আসে এই মহা নায়ক, তখন গ্যলারী ভরা দর্শক দু-চোখ ভরা ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে। সকলের মনে প্রাণে একটাই চাওয়া, মহানয়কের মহাকাব্য রচিত হোক। সবাই হয়তো প্রার্থনাও করছিলেন। কারণ যারা ক্রিকেট বুঝেন, ক্রিকেটিয় ভাষা বুঝেন তাদের হৃদয়ের খুব গভীরে নিশ্চই থাকবেন এই নায়ক। তাই সকলেই মহানায়কের মহাকাব্য রচিত হোক এমনটা চাইতেই পারেন। চাইতে পারেন বললে ভুল হবে। সত্যি বলতে খুব করে চেয়েছেন সবাই।

আর সেই চাওয়াটাও পূরণ হলো। ৯৬ রান করা কুক ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে বল ঠেলে দিয়ে রানের জন্য ছুটলেন। কিন্তু তাতে রান হওয়ার কথা ১, ৯৬ থেকে ৯৭ রানে পৌঁছবেন। তবে মহানয়কের মহাকাব্যটা যে তখনি রচনা হবে সেটা কে জানত! ভারতীয় ফিল্ডার রান আউটের চেষ্টায় থ্রো করে বসেন, যা স্টাম্পের ধারকাছ দিয়েও যায়নি। উল্টো বল গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যায় বাউন্ডারি সীমানার ওপারে। অ্যালিস্টার কুকের বিদায়টা আলোর ঝরনাধারায় ঝলসে ওঠে তাতেই। ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টে, শেষ ইনিংসে সেঞ্চুরি করলেন এ কিংবদন্তি।

যার এতো এতো ভক্ত-অনুরাগী রয়েছেন তার বিদায় বেলায় এমন কিছু উপহার দিয়ে যেতেই হয়। আর সেটাই করলেন এই মহানায়ক। ভারতের বিপক্ষেই ২০০৬ সালের মার্চে নাগপুরে টেস্ট অভিষেক হয় কুকের। অভিষেকে করেছিলেন সেঞ্চুরি। কী মিল দেখুন! ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্টে প্রথম ইনিংসে ফিফটি, দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি। আর শেষ টেস্টেও একই, প্রথম ইনিংসে ফিফটি আর দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি। এ যেন সত্যি সত্যিই একটি মহাকাব্য। ক্রিকেটের জগতে আরো একটি অদ্ভুত এবং অবাক হওয়ার বিষয় এটি।

সৃষ্টির্কতা আসলেই মহান। যার প্রাপ্য যতটুকু তাকে ততটুকুই দিয়ে ভরিয়ে দেন। সেঞ্চুরি করার পর ভারতীয় ফিল্ডাররা সবাই হাত মেলালেন কুকের সঙ্গে। আর ভরা গ্যালারির হাততালি তো চলছেই। ওভালের ভরা গ্যালারির দর্শকদের অভিবাদন যেন শেষ হয় না। সবাই দাঁড়িয়ে হাততালিতে ব্যস্ত। দুই সন্তানসহ তাঁর স্ত্রীও সেই জনারণ্যে। হেলমেট খুলে, ব্যাট উঁচিয়ে অভিনন্দনের জবাব দেন কুক। ব্যাটিং সঙ্গী জো রুট এসে জড়িয়ে ধরেন আবেগ এবং ভালোবাসা নিয়ে। ফিসফিসিয়ে বলেনও হয়তো-বা, ‘তোমার মতো কিংবদন্তির এমন বিদায়ই প্রাপ্য।’

মাঠ থেকে কুকের বিদায়টা হয়েছে ১৪৭ রান করার পর। হনুমা বিহারীর বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে জীবনের শেষ টেস্টের শেষ ইনিংস সমাপ্ত করেন এই মহানয়ক। ঠিক আগের বলে ২৫৯ রানের জুটি ভেঙে বিদায় নিয়েছিলেন সেঞ্চুরিয়ান রুটও। তবে এসব কেবলই যেন চিত্রনাট্যের পার্শ্বচরিত্র। মূল চরিত্রে ৩৩ বছর বয়সে ৩৩তম টেস্ট সেঞ্চুরিতে বিদায়টা রাঙিয়ে দেওয়া অ্যালিস্টার কুকই। ইংল্যান্ডের জার্সি পরে আর কখনো খেলবেন না তিনি। কিন্তু ইংলিশ ক্রিকেটের অংশ হয়ে থাকবেন আজীবন।

সিরিজের ফল যেহেতু আগেই নির্ধারিত, সে কারণে ওভাল টেস্টটি ছিলো শুধুই ‘কুকের বিদায়ী ম্যাচ’। সে বিদায়টা কত অন্য রকম হওয়ার আশঙ্কাই না ছিল! ভারতের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম চার টেস্টে কুকের ব্যাটে ছিলো রানখরা। ১৩, ০, ২১, ২৯, ১৭, ১৭ ও ১২ এই ছিল তাঁর ইনিংসগুলো। সাউদাম্পটন টেস্টের পর হুট করেই ঘোষণা দেন, ওভালে সিরিজের শেষ টেস্টই হবে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। রানখরায় থাকা এই ওপেনারের বিদায়ে করুণ সুর বাজছিল পুরো ক্রিকেট পাড়াই। শেষ টেস্টে তা তিনি বদলে দেন দারুণ ঝঙ্কারে। প্রথম ইনিংসে ৭১ রান করলেও সেঞ্চুরি না পাওয়ার হাহাকার না পুড়িয়ে পারে না। দ্বিতীয় ইনিংসে আর আক্ষেপের কোনো অবকাশ রাখলেন না। ঠিকই করলেন সেঞ্চুরি। এক যুগ আগে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন দুই ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি ও সেঞ্চুরিতে। একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টেও তাই। ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে শুরু-শেষের এমন কীর্তি এ কিংবদন্তির। আর প্রথম ও শেষ টেস্টে সেঞ্চুরিয়ানদের অভিজাত তালিকায় তিনি পঞ্চম সংযোজন। এ তালিকায় প্রথম ব্যাটসম্যান অস্ট্রেলিয়ার রেজিনাল্ড ডাফ, শেষ টেস্টটি তিনি খেলেছেন ১৯০৫ সালে। তালিকায় দ্বিতীয় নামটি অস্ট্রেলিয়ারই উইলিয়াম পন্সর্ফোড। তৃতীয়টি ১৯৮৪ সালে ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলা গ্রেগ চ্যাপেল। তিন অস্ট্রেলীয়র পর এ রেকর্ডটি মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের, সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক যদিও কুকের মতো ঘটা করে বিদায় জানাতে পারেননি। ঘটনাক্রমে ২০০০ সালের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলা বেঙ্গালুরু টেস্টই তাঁর শেষ টেস্ট হয়ে আছে, যেটির দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিলেন ১০২ রান। ১৮ বছর পর এই বিরল রেকর্ডে নাম তুললেছিলেন কুক।

জীবনের শেষ ইনিংসে কুমার সাঙ্গাকারাকে পেছনে ঠেলে টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের মধ্যে পাঁচ নম্বরের উঠে আসেন তিনি। শচীন টেন্ডুলকার (১৫,৯২১), রিকি পন্টিং (১৩,৩৭৮), জ্যাক ক্যালিস (১৩,২৮৯), রাহুল দ্রাবিড় (১৩,২৮৮) এদের পরেই টেস্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক কুক। তাঁদের সবাই ডানহাতি বলে বাঁহাতিদের মধ্যে সর্বোচ্চ টেস্ট রানের রেকর্ডটিও সাঙ্গাকারার কাছ থেকে কেড়ে নিলেন কুক। ইংলিশ ওপেনার দেশটির সর্বোচ্চ টেস্ট রানের মালিক এবং দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলেছেন তিনি। সর্বোচ্চ ৫৯ টেস্টে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্বও তিনি দিয়েছেন। ক্যারিয়ারে ৩২টি টেস্ট সেঞ্চুরি আছে তার নামের পাশে। তবে টেস্টের তুলনায় কুকের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি পরিসংখ্যান তেমনটা সমৃদ্ধ নয়। যে কারণেই হয়তো ৯২ ওয়ানডে ও ৪টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেছেন তিনি। খেলছেন ১২ বছর নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। অথচ মাত্র ৩৩ বছর বয়সে নিয়ে নিলেন কঠিন এবং ক্রিকেট ভক্তদের জন্য একটি বড় কষ্টের সিদ্ধান্ত। আর কিছুদিন খেলে গেলে আরও কিছু রেকর্ড বগলদাবা হতো তার। কিন্তু সেসবের হিসেব-নিকেশ না করে অবসরের ঘোষণা দিয়ে বসেন তিনি।

বিদায় বেলায় তাকে সাবেক-বর্তমান ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট আলোচকরা টুইটারে শুভকামনা জানিয়েছিলেন। মাইকেল ভন বলেন, “ইংল্যান্ডের জার্সি পরে আর কোন খেলোয়াড় তার থেকে বেশি দিতে পারেনি। সার্মথ্যের বিচারে তার থেকে বেশি ভালো কেউ খেলতে পারেনি। অ্যালিস্টার কুক যে মানসিক শক্তি দেখিয়েছে তা আর কেউ পারেনি। সবকিছুর বাইরে আমরা যত ক্রিকেটার পেয়েছি সে তাদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি সূক্ষণ। অনেক স্মৃতি উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ কুক।”
বোরিয়া মজুমদার বলেন, “অন্যতম সেরা ক্রিকেটার অ্যালিস্টার কুক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ইংল্যান্ডের এক ভয়ঙ্কর ক্রিকেটার তিনি। আমার মতে, ভারতের বিপক্ষে ২০১২ সালে স্পিনের বিপক্ষে নিজের সেরাটা খেলেন তিনি। তার জন্য শুভ কামনা।”
ক্রিকবাজডটকম ইংল্যান্ড ওপেনারের দারুণ কিছু রের্কডের কথা উলে¬খ করে টুইট করেছিলো। “কুক ওপেনার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ওপেনে ব্যাট করে ১১ হাজার ৬২৭ রান করেছেন তিনি। তার পরের আছেন সুনীল গাভাস্কার। তিনি ৯ হাজার ৬০৭ রান করেছেন। এছাড়া স্মিথ (৯,০৩০), হেইডেন (৮,৬২৫), সেবাগ (৮, ২০৭), বয়কট (৮,০৯১) রান করেছেন। শুধু তাই নয় অধিনায়ক হিসেবে কুকের রান নজরকাড়া। তিনি অধিনায়ক হিসেবে করা রানের তালিকায় ছয়ে আছেন।”
হার্শা ভোগলে বলেন, “অ্যালিস্টার কুক কি দারুণ এক ক্যারিয়ার পার করলেন! ইংল্যান্ডের সেরাদের একজন তিনি। ক্যারিয়ারে যা অর্জন করেছেন তাতে বিরাট গর্বের সঙ্গে অবসর নিচ্ছেন তিনি।”
মোহাম্মদ কাইফ বলেন, “দারুণ এক ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন কুক। যেভাবে ক্রিকেটে ব্যাট চালিয়েছ তার জন্য গর্বিত হতে পারো। ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা।”
জনি বেয়ারস্টো বলেন, “একজন সত্যিকারের লিজেন্ড। যিনি মাঠে এবং মাঠের বাইরে দারুণ কিছু উচ্চতার চিহ্ন এঁকে দেন। তার সঙ্গে খেলতে পারা আলাদা সম্মানের ব্যাপার। তারার মতো জ্বলজ্বলে ক্যারিয়ারের জন্য ধন্যবাদ।”
এমন কিংবদন্তিকে হয়তো কখনো ভুলা যাবে না। এর চেয়ে সুন্দর বিদায়ও আর হয় না! অ্যালিস্টার কুক যেন নিজ হাতে নিজের গৌরবময় বিদায়ের চিত্রনাট্য লিখলেন। যে চিত্রনাট্যটি কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তের হৃদয়ে আজীবন স্মৃতি হয়ে থাকবে। হয়তো বা মাটে আর দেখা যাবে না প্রিয় ক্রিকেটারকে। দেখা যাবে না তার দৃষ্টিনন্দন ব্যটিং। তবে হ্যাঁ কোটি কোটি ক্রিকেট প্রেমির হৃদয়ে তাকে প্রতিনিয়ত দেখা যাবে। কোটি কোটি ক্রিকেটিয় অন্তরে কুক সবসময় বসবাস করছেন। সেই বসবাস স্থায়ী, সেখানে নেই কোনো অবসর, নেই কোনো বিদায়। আজীবন ইতিহাস আর ক্রিকেট প্রেমি মানুষের মাঝে বাস করবে এই র্কীতিমান।

লেখক : আজহার মাহমুদ
প্রাবন্ধিক, ফিচার লেখক।