• ক্রিকেট

বাইশ গজ থেকে ফাঁসির মঞ্চে!

পোস্টটি ৩১৭ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

জ্যামাইকার এক অস্বচ্ছল পরিবারে জন্ম লেসিল হিল্টনের। দারিদ্র্যের চরম কষাঘাতেই বেড়ে উঠা। জন্মের পর বাবার স্নেহের ছিঁটেফোঁটাও জোটেনি তার কপালে। বয়স তিন পেরোতেই হারিয়েছেন মাকেও। ছোট্ট শিশুর লালন-পালনের ভার আসে বোনের উপর। বয়স যখন বারো, মৃত্যু খুঁজে নেয় তার বোনকেও। তারপর শুরু হয় পৃথিবীতে তার নিঃসঙ্গ বসবাস। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়ে অভাবের সকল অধ্যায়-ই তার মুখস্থ হয়েছে ততদিনের স্বল্প বারো বছরের জীবনে। লেখাপড়াকে নির্বাসনে পাঠাতে হয় উপায় খুঁজে না পেয়ে। দর্জির দোকান ও জাহাজঘাটে শ্রমিকের কাজ শুরু করেন জীবিকার হাল ধরতে।

সাধারণত প্রতিভার কোনো ধর্ম-বর্ণ নেই। তাই ধনী-গরীবের ফারাক কখনোই প্রতিভার বিচারে পাত্তা পায়না। প্রতিভা ধরা দেয় যেকোনো ঘরেই কিংবা ব্যক্তির কাছে। হিল্টনের ক্রিকেট প্রতিভাও তাই চাপা পড়ে থাকেনি। ক্রিকেটের মাধ্যমেই তিনি অতীতের কষ্টের দিনগুলোকে তাড়িয়ে দেন জীবন থেকে। বাইশ বছর বয়সে জ্যামাইকান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের নিয়মিত সদস্য হন ১৯২৭ সালে। ক্রিকেটেই দেখা পান রঙিন দিনের। এক পর্যায়ে জীবিকার মূল অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় ক্রিকেট।

উইন্ডিজ জার্সি গায়ে জড়ানোর সুখানুভূতি নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী আট বছর। পাড়ি দিতে হয় সুদূর বন্ধুর পথ। উইন্ডিজ জাতীয় দলে নিজের নাম লেখান ১৯৩৫ সালে। সফরকারী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজে বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার নৈপুণ্য সিরিজ জয়ের স্বাদ পেতে সহায়তা করে উইন্ডিজ দলকে। যদিও পরবর্তীতে ফর্মহীনতায় দলে জায়গা হারান। ১৯৩৯ সালে পুনরায় জাতীয় দলে ফেরত আসেন। সে বছর-ই সবশেষ খেলেন জাতীয় দলের হয়ে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উইন্ডিজ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ৬ ম্যাচ। শিকার করেছেন ১৯ উইকেট।

ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর ভালোবেসে বিয়ে করেন প্রেমিকা লোর্লিন রোজকে। বিয়ের গল্প শুরুতে নিয়ে আসা হলেও, এতোটাও সহজ ছিলোনা তাদের সম্পর্কের পথ। পেরোতে হয়েছে নানা চড়াই-উতরাই। প্রেমিকা রোজ ছিলেন জ্যামাইকার পুলিশ ইন্সপেক্টরের বোন। অন্যদিকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হয়েও হিল্টন হতে পারেননি রোজের পরিবারের পছন্দের পাত্র। মূলত হিল্টনের পারিবারিক অবস্থান ও শিক্ষাগত যোগ্যতা এতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের ফাইলে তাদের পারিবারিক কোনো কুকীর্তির রেকর্ড রয়েছে কিনা! সেই খোঁজ-খবর নেন প্রেমিকা রোজের ইন্সপেক্টর বড় ভাই। প্রথমবস্থায় তাদের বিয়ে নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলেও তা পরবর্তীতে বাস্তবে রূপ নেয়, হিল্টনের পরিবার অপরাধমুক্ত থাকায়। ভালোবাসার জয় হয়, দু'জন বিবাহবন্ধনে আবন্ধ হন ১৯৪২ সালে।

১৯৪৭ সালে তাদের ভালোবাসার ফসল হিসেবে জন্ম নেয় একটি পুত্র সন্তান। বিবাহ পরবর্তী জীবনে লের্লিন রোজ তার অপূর্ণ বাসনা পূরণ করার আগ্রহ প্রকাশ করলে, স্বামী হিল্টন পূর্ণ সহযোগিতা করেন। ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে জ্যামাইকা থেকে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সেখানে তাকে দীর্ঘসময় অবস্থান করতে হয়। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে চিঠি ছিলো তাদের একমাত্র উপায়। ছুটিতে জ্যামাইকায় ফিরলেও বেশিদিন অবস্থানের সুযোগ পেতেন না। দূরত্বের মাঝেও তাদের ভালোবাসা ছিলো জীবিত। সম্পর্কের গভীরতা নষ্ট হয়নি।

তবে সুন্দর চলতে থাকা দু'জনের সম্পর্কে বাঁধ সাধে একটি অজ্ঞাত চিঠি। লোর্লিন তখন নিউইয়র্কে। হিল্টনের কাছে অজ্ঞাত নামে নিউইয়র্ক থেকে একটি চিঠি আসে জ্যামাইকায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ' তার স্ত্রী লোর্লিন রোজ নিউইয়র্কে অন্য এক পুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িত।' জ্যামাইকার ঘরে বসে চিঠির প্রতিটা শব্দ হজম করা ছিলো অসম্ভব ব্যাপার হিল্টনের জন্য। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন হিল্টন। প্রিয় লোর্লিন রোজের সম্পর্কে এমন তথ্য তাকে উদ্বিগ্নতার সাগরে পতিত করে দেয়। দ্রুত টেলিগ্রামে লের্লিন কে দেশে ফেরত আসার জন্য তাড়া দেন। আক্রোশে শশুর বাড়িতে স্ত্রী লের্লিনের কীর্তির কথাও জানায় হিল্টন। স্বামীর তাড়া সত্ত্বেও স্ত্রী লোর্লিন রোজ বাড়ি ফেরে এক মাস পর।

কালক্ষেপণ করে বাড়িতে ফেরার বিষয়টি ধারণা দেয় হিল্টনের ব্যাপারে রোজের মানসিক তিক্ততার। বাড়িতে ফিরে স্বামীর জেরার মুখে পড়তে হয় লোর্লিনকে। চিঠিতে উল্লেখিত প্রতিটি শব্দের সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে জোরালোভাবে অস্বীকার করেন লোর্লিন। অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে লোর্লিনকে নিজের করতে পেরেছিলেন হিল্টন। তাই হারাতে চাননি ভালোবাসার মানুষকে। তাই স্ত্রী অস্বীকার করলেও, তাই বিশ্বাস করে নেন হিল্টন। দিনকয়েক না পেরোতেই এবার লোর্লিন কে হাতেনাতে ধরে ফেলেন হিল্টন। নিউইয়র্কের প্রেমিকের জন্য লেখা চিঠি পাঠানোর পূর্বে হিল্টনের কাছে হাতেনাতে ধরা খেয়ে পুনরায় জেরার মুখে পড়লে, এবার অকপটে সব স্বীকার করে নেয় লোর্লিজ রোজ।

নিউইয়র্কের প্রেমিকের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠির প্রতিটি শব্দ হিল্টনের বুকে বুলেটের মত বিঁধতে শুরু করে। চিঠিতে এটিও উল্লেখ ছিলো যে, 'হিল্টনের ভালোবাসার নিয়মের উপর অতিষ্ঠ হয়ে গেছি, কুৎসিত চেহারার হিল্টন একজন নীচু পরিবারের সদস্য।' এমন সব কথা পড়ে স্ত্রীর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের স্তম্ভ মূহুর্তেই মাটিতে ধসে পড়ে৷ রাগে নিজেকে সামলে রাখতে হিমশিম খাচ্ছিলেন হিল্টন। বহুবার চেষ্টা চালিয়েও হিল্টন নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। তাছাড়া ভালোবাসার মানুষের করা বিশ্বাসঘাতকতা তিনি কোনোভাবেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছিলেন না। শুধুমাত্র হিল্টন নয়, যে কারো পক্ষেই এমনকিছু মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। দু'জনের মধ্যে চলতে থাকে তর্ক। বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে গুলির আওয়াজের শব্দে বাড়ির চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চারপাশ থেকে আন্দাজ করা হচ্ছিলো হিল্টন ও লোর্লিনের ঘরে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে। পরে পুলিশ এসে লোর্লিনের লাশ উদ্ধার করে।

আদালতে বিচার শুরু হলে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালান হিল্টন। আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'স্ত্রী লোর্লিন-ই প্রথম তার দিকে অস্ত্র তাক করে, নিজের আত্মরক্ষার্থে-ই তিনি অস্ত্র কেড়ে নিয়ে গুলি ছোঁড়েন।' যদিও তার যুক্তি হেরে যায় লোর্লিনের শরীরে সাতটি বুলেটের সন্ধান পেয়ে। কেননা, সাতটি বুলেট কোনোপ্রকার প্রস্তুতি ছাড়া ছোঁড়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রমাণিত হয় তিনি পরিকল্পিতভাবেই খুন করেছেন। যদিও ফরেনসিক রিপোর্ট আদালতে দেওয়া হিল্টনের বক্তব্যকে সমর্থন করে।

এই হত্যাকান্ডের বিচারের মূল বিচারপতি ম্যাকগ্রেগরের রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, 'তিনি নীচু জাতের মানুষদের সহ্য করতে পারতেন না।' আদালতে বিচার চলাকালীন হিল্টন কে অপ্রস্তুত করে দিতেন তিনি সর্বদা। হিল্টন যেহেতু দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা একজন, তাই তার প্রতি বিচারক ম্যাকগ্রেগরের ছিলো তার নিজস্ব স্বভাবগত আক্রোশ। যেহেতু তিনি নীচু জাতের মানুষ পছন্দ করতেন না, তাই আদালতে প্রতিনিয়ত হিল্টনকে অসহায় করে তোলাই তার কাছে আনন্দদায়ক ছিলো। সম্ভবত এই কারণেই মৃত্যুদন্ডের রায় প্রদান করতে বেশীক্ষণ ভাবতে হয়নি বিচারক ম্যাকগ্রেগরকে।

হিল্টন জন্মের পর থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যতদিন বেঁচে ছিলেন, অধিকাংশ সময়-ই যন্ত্রণা অনুভব করে গেছেন। যন্ত্রণা যেন তার আরেক জীবনসঙ্গী হিসেবে দেখা দিয়েছিলো। যন্ত্রণা নিয়ে জন্ম আবার যন্ত্রণা কে সাথে করেই বিদায় নিতে হয়েছে তাকে এই রঙিন দুনিয়া ছেড়ে। স্ত্রী হত্যার দায়ে ১৯৫৫ সালের ১৭ই মে সকালে ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে তাকে ঝুলতে হয় ফাঁসির দড়িতে। ত্যাগ করতে হয় জীবনের মায়া। 

 

এমন জীবন কাহিনীর জন্যেই তো, 'জীবন নাটকের চেয়েও অতিনাটকীয়' উক্তির সার্থকতার প্রমাণ মিলে