• ফুটবল

২৮ বছর পর...

পোস্টটি ৪৩২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
তখন হেফজখানায় পড়ি। সাড়ে ছয়টা-সাতটার দিকে সকালের নাস্তার ছুটি মিলতো। নাস্তা সেরে এসে দেখি, ফোরকান ভাই রেগেমেগে অস্থির। সে ছিল আর্জেন্টিনা সমর্থক। রেফারী নাকি ইচ্ছে করে হারিয়ে দিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। নওশাদ ভাই, তারেক, রিয়াদ ভাই সবাই ছিল আর্জেন্টিনা সমর্থক। কারোরই ভিন্নমত নেই এই ব্যাপারে। অতিরিক্ত সময়ের ‘সময়’ শেষ হলেও রেফারি বাঁশি বাজাননি, ফলে সেই সময়ের গোলে আর্জেন্টিনার নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয়ে যায়। তখন ওদের মুখে শুনতাম রেফারিরা আর্জেন্টিনা বিদ্বেষী, আর ব্রাজিল-পন্থী হয়। এমনকি ফিফাও নাকি আর্জেন্টিনাকে সহ্য করতে পারে না।
 
আমার দুনিয়া তখন ক্রিকেটময়। ফুটবলে অত আগ্রহ নেই। ২০০২ বিশ্বকাপে ওরা যখন সমানে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে ব্যস্ত, আমি তখন ফ্রান্স সাপোর্টার। কারণ, ফ্রান্স ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই সেনেগালের কাছে হেরে গেল ফ্রান্স, আমি আবার দল পাল্টে সেনেগাল সমর্থক। সেনেগালের স্বপ্ন দৌড় সেবার কোয়ার্টারে থেমে গেলেও ওসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামানো হয়নি আর।
ব্রাজিলে তারকার মেলা তখন। নতুন নতুন তারকাও উঠে আসছে। রবিনহো, আদ্রিয়ানোর মতো আরো অনেকে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নও ওরা। তবু দলটা কেনো সেভাবে টানেনি, জানি না। ২০০২ ফুটবল উন্মাদনা শেষে জানতে পারি, রিয়াল মাদ্রিদ দলটা তারকায় ঠাসা। রোনালদো, ফিগো, জিদান, বেকহাম… বিশ্বের সেরা সেরা সব খেলোয়াড়। এই দল চ্যাম্পিয়ন না হয়ে যায় না। আমি ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদ সাপোর্টার বনে যাই। খেলা দেখি বা না দেখি, বুঝি বা না বুঝি, সাপোর্ট করতে সমস্যা কী!
 
তারপর শৈশব পেরিয়ে কিশোরবেলা, হেফজখানা ছেড়ে এসেছি, ফোরকান ভাই-রিয়াদ ভাইদের সঙ্গে নিত্য দেখা হয় না। কীভাবে কীভাবে কাতালোনিয়ার ইতিহাসে মুগ্ধ হয়ে পড়ি। পত্রিকার পাতায় বিশ্বকাপের ইতিহাস পড়তে গিয়ে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা কেড়ে নেয় সমস্ত আবেগ। ১৯৫৪-এর হাঙ্গেরি ও ১৯৭৪-এর নেদারল্যান্ডের জন্য দুঃখ হয়, তবে আবেগের সমস্ত দখল করে নেয় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। ১৯৯০-এর বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার কান্নার দৃশ্যটায় আটকে থাকে চোখ, কোডেসাল নামক রেফারিকে কোনোদিন ক্ষমা করা হয় না, জার্মানী নামক যন্ত্রমেশিনের জন্য বরাদ্দ হয় একরাশ বিতৃষ্ণা।
 
২০০৬ বিশ্বকাপে আমি হয়ে পড়ি পাকাপাকি আর্জেন্টিনা সমর্থক। এই যে বার্সা-আর্জেন্টিনা জোট শোনা যায় আজকাল, খুব সম্ভব মোটাদাগে মেসির জন্যেই, কিশোরকালের আবেগের ফলে আমিও এই জোটের অংশীদার। রাত জেগে খেলা দেখা, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ পড়া, ফুটবলটাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করা সেই প্রথম। জার্মানীর সঙ্গে হেরে আর্জেন্টিনার বিদায়ের পর সারারাত ঘুম নামে না চোখে। ইশ, যদি এমন হতো, ফিফা যদি ঘোষণা করে, ম্যাচটা বাতিল। বা এমন কোনো কারণ পাওয়া যায়, যার কারণে জার্মানীর বদলে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল খেলবে! বাস্তবে তা না হলেও ইতালি জার্মানীকে হারিয়ে দিয়ে ক্ষতস্থানে খানিক প্রলেপ দেয়।
ম্যারাডোনা ও মেসি মিলে ‘মেসিডোনা’ হয়েও ২০১০ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের গন্ডি পেরোনো হয় না আর্জেন্টিনার। সেই জার্মানী! কিন্তু জোয়াকিম লো’র জার্মানী কেন যেন অতটা ঘৃণা পায় না।
 
পরপর তিনটি ফাইনালা। ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬। আতলামো করে শতবর্ষী কোপার শিরোপা মেসির হাতে উঠছে বলে একটা লেখাও লিখে ফেললাম। কিন্তু শিরোপা সেই অধরাই থাকে। অভিমান করে অবসরের ঘোষণাও দেন, আধুনিক ফুটবলের অবিসংবাদিত সম্রাট। সেই নিয়ে হাস্যরসও কম হয়নি। ২০১৮ বিশ্বকাপে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গেলেও ম্যারাডোনা কেমন যেন আবেগ উতলে দেন। ঈশ্বর নাকি এবার আর্জেন্টিনার সঙ্গে আছেন! হায়, ম্যারাডোনা! নিয়তির কী অদ্ভুত পরিহাস, ঠিক তার মৃত্যুর পরই শিরোপা আর্জেন্টিনার।
স্বাভাবিকভাবেই কৈশোরের সেই আবেগ নেই এখন। ফুটবল নিয়ে অত আদিখ্যেতাও হয় না। রাত জেগে কবে খেলা দেখেছি মনে নেই। জীবন দর্শনও বদলে গেছে। খেলাধুলা নিয়ে এই উন্মাদনা, প্রিয় দলের জন্য এই অকুন্ঠ সমর্থন-ভালোবাসা কখনো সখনো মনে হয় মূল্যহীন। ব্রাজিলে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বকীয়তা নেই, নিজেদেরই চেনে না তারা। ভুলে গেছে পরিচয়। আর্জেন্টিনার ইতিহাস আরো করুণ, পড়ে মন কেমন যেন আদ্র হয়ে যায়। প্রবল বর্ণবাদী এক প্রেসিডেন্ট পুরো আর্জেন্টিনাকে কৃষ্ণাঙ্গ মুক্ত করার মহান (!) ব্রতে লিপ্ত হন। কৃষ্ণাঙ্গদের ধরে-বেঁধে যুদ্ধে পাঠানো হয়, লঘু পাপে দেয়া হয় গুরু দন্ড। কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে বিপুল হারে। মাত্র আড়াইশো বছরের ব্যবধানে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ আধা-আধা অনুপাত থেকে হয়ে পড়ে ৯৭:০৩; আর্জেন্টিনা এখন সাদা মানুষের দেশ।
 
তারপরও কোপার শিরোপা হাতে মেসিকে দেখে পুলক অনুভূত হয়। বহু আরাধ্য ট্রফিটায় চুমু আঁকা দেখে মনে পড়ে সেইসব বিষণ্ণ ভোর, বাকহীন সেইসব প্রহর। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে মধ্যরাতে এক বন্ধুর ফোন— কেমন বোধ হচ্ছে?
 
পুরো আর্জেন্টিনায় আনন্দের বান। ২৮ বছর পর শিরোপা জয়। অনেকে শচীন টেন্ডুলকারের সঙ্গে মেসির তুলনা টানছেন, শচীনের ভারতও বিশ্বকাপ জয় করেছিলেন ২৮ বছর বাদে। ম্যারাডোনা বেঁচে থাকলে কী করতেন জানি না। নিশ্চয় অভিনব কিছু করতেন, হয়তো এমন কিছু যাতে মানুষ আরো আবেগী হয়ে পড়ে, যেনো উষ্ণ জলকেলির উচ্ছ্বাস হয় চোখের কোণে। ভদ্রলোকের আত্মজীবনী পড়ছি, চমৎকার অনুবাদ হয়েছে বলে পড়ে আরাম আছে। তাই মনেও পড়ছে তাকে। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে, ম্যারাডোনা যতদিন ছিলেন আর্জেন্টিনা আর কোনো ট্রফি পায়নি। ম্যারাডোনাকে আর্জেন্টিনায় ঈশ্বর ডাকা হয়, তিনি মৃত্যু-অবধি জানতেন — ঈশ্বরের পাশে ট্রফি শোকেসে বসার মতো যোগ্যতা কেউ অর্জন করতে পারেনি!