• ক্রিকেট

ক্রিকেট মাঠের আগুন-গদ্য : ০২

পোস্টটি ৩৯৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ক্রিকেট মাঠের আগুন-গদ্যের সূচনা পর্বের পর আমরা এবার দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় প্রবেশ করছি।

 

আমাদের আলোচনার শুরুতেই থাকছেন—শাহাদাত হোসাইন রাজীব। তিনি বিতর্কিত এবং দর্শক-প্রিয় নন তেমন একটা। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম দশকের টেস্ট আঙিনায় তিনি ছিলেন অন্যতম মূখ্য চরিত্র। ডেভ হোয়াইটমোর, জেমি সিডন্সদের মতো কোচের সুনজর ছিল তার উপর। তার উচ্চতা ও পেস (যদিও সেরকম আগুনে পেস নয়, তবে কার্যকর এবং সেই সময়ের জন্য চলনসই।) টেস্ট ক্রিকেটের জন্য একদম যুৎসই। কোচ প্রেসক্রাইব করতেন, শাহাদাত যেন সাদা পোষাকেই নিবদ্ধ রাখেন দৃষ্টি। শাহাদাতও তেমনই চাইতেন। তবে চোট, ফর্মহীনতা ও মাঠের বাইরের বিতর্ক, তাকে সেই অবস্থানে পৌঁছার সুযোগ দেয়নি, যেখানে তিনি পৌঁছতে পারতেন।

সে যাকগে, আমরা মূল আলোচনায় ফিরি।

 

রঙ্গমঞ্চ— শেরে বাংলা স্টেডিয়াম, মিরপুর, ঢাকা আঙিনা— টেস্ট ক্রিকেট। প্রতিপক্ষ— দক্ষিণ আফ্রিকা। সময়কাল— ফেব্রুয়ারি, ২০০৮।

হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিকদের মতো প্রবীণ ও অভিজ্ঞদের ফর্মহীনতা ও বয়সের দোহাই দিয়ে বিদায় জানানোর মঞ্চ প্রস্তুত। মোহাম্মদ আশরাফুল দলের নেতৃত্বে। মাশরাফি মর্তুজার সঙ্গে নতুন বলের সঙ্গী শাহাদাত হোসাইন। এই দু’জনের জুটি বেশ আশাজাগানিয়া ততদিনে, যদিও একত্রে খেলার সুযোগ হয় কম। চোট হানা দেয় বারবার।

টসজয়ী বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নেমে দিনের দ্বিতীয় বলেই উইকেট হারায়, ফলে সেই যে ধ্বংসস্তুপের সূচনা হলো, সময়ের সাথে সেই ধ্বংসস্তুপ ছোট থেকে ধীরে ধীরে আকারে বড় হয়েছে কেবল।  মাত্র ১৯২ রানেই দম শেষ বাংলাদেশের। তখন প্রথম দিনের দুটো সেশন পেরিয়েছে মাত্র।

 

দক্ষিন আফ্রিকার ইনিংস আধঘন্টা না পেরোতেই শাহাদাতের আঘাত। নিজের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওভারে এবং ইনিংসের চতুর্থ ও ষষ্ঠ ওভারে দুই ওপেনারকে ফিরিয়ে আশার সলতেয় জ্বালানী দিলেন তিনি। রীতিমতো আগুন ঝরালেন। প্রথম দিন শেষে তার বোলিং ফিগার ৯ ওভার, ৫ মেইডেন, ১৭ রান, ২ উইকেট।

দ্বিতীয় দিনের সূচনার ভার মাশরাফির সঙ্গে অভিজ্ঞ রফিকের কাঁধে। ওভার কয়েক পরই অধিনায়ক তার শরণাপন্ন হন, মোটে দুটো ওভার করলেন, আবার আক্রমণ থেকে সরিয়ে দেয়া হলো তাকে। ১১ ওভার, ৫ মেইডেন, ২৪ রান, ২ উইকেট।

 

দক্ষিণ আফ্রিকার সেরা দুই ব্যাটসম্যান (হাশিম আমলা ও জ্যাক ক্যালিস) বোকা বনেছেন রফিকের অভিজ্ঞতার কাছে, অ্যাশওয়েল প্রিন্স হয়েছেন রান আউট। মাত্র ৭৭ রানেই অর্ধেক হাওয়া অতিথি দলের, এবি ডি ভিলিয়ার্স ও জোহান বোথা ইনিংস মেরামতের চেষ্টায় লিপ্ত। রফিক-সাকিব, কখনো রফিক-মাশরাফি, অধিনায়কের চেষ্টায় শাহাদাত নেই তখনো। জুটিটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে বাংলাদেশের সংগ্রহের কাছাকাছি পৌঁছাতে চায় দক্ষিণ আফ্রিকা।  

 

অধিনায়ক আশরাফুল রফিকের প্রান্ত বদলাতে চান, সঙ্গে শাহাদাতকে আনতে চান আরেক প্রান্ত দিয়ে। তাই বল হাতে নেন নিজেই, এক ওভারের পরিকল্পনা, তারপরই রফিক-শাহাদাত এর জুটিবদ্ধ আক্রমণ। কিন্তু প্রান্ত বদলের কারিকুরির এক ওভারেই বাজিমাৎ আশরাফুলের। অথবা ডি ভিলিয়ার্সের দুর্ভাগ্য। আশরাফুলের প্রথম বলটি প্রথমে পিচের অর্ধেক পেরোনোর আগেই এক ড্রপ খেল, তারপর ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটের সামনে আরেকড্রপ। ‘লোপ্পা’ বল মনে করে হিট করতে গিয়ে মিসহিট করে বসেন ডি ভিলিয়ার্স। অতএব, আশরাফুলের কট এন্ড বোলের শিকার হয়ে ডি ভিলিয়ার্সের বিদায়। ৬৮ রানের প্রতিরোধ-পার্টনারশিপেরও সমাপ্তি। পরের ওভারেই রফিক, এবং তারপর এলেন শাহাদাত।

 

আর তারপরই আগুনে গদ্যের অবাক উপস্থাপনা। বাংলাদেশ ক্রিকেট এমন দেখেনি আগে। শাহাদাতের ২৭ বলের দুরন্ত এক স্পেলে দক্ষিণ আফ্রিকার সব শেষ। এই সময়ে তিনটি মেইডেনের পাশাপাশি, ২৪টি ডট ও ৩ রান দিয়ে, ৪টি উইকেট পকেটস্থ করেন শাহাদাত। একে একে তুলে নেন— বোথা, মরকেল, বাউচার, স্টেইন।

দক্ষিণ আফ্রিকা ১৭০ রানে অল আউট। বাংলাদেশের লীড ২২! আর শাহাদাত হোসাইনের বোলিং ফিগার— ১৫.৩ ওভার, ৮ মেইডেন, ২৭ রান, ৬ উইকেট। অবিশ্বাস্য, স্রেফ অবিশ্বাস্য।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমগ্র ফাস্ট বোলিং ইতিহাসে এমন দুরন্ত স্পেল, এমন দাপুটে বোলিং ফিগার, খুব একটা নেই। আর আগুন? শাহাদাতের বোলিংয়ে তা থাকতোই। শাহাদাতের পেস যেমনই হোক, বল ডেলিভারির সময় জোরের সঙ্গে আওয়াজ ও ডেলিভারির পর চোখে আগুন— এই দুটো রাখতেনই।

****

 

 

পরের গল্পে থাকছেন—রবিউল ইসলাম শিপলু। বাংলাদেশ ক্রিকেট তার মতো নিবেদিত, তার মতো পরিশ্রমী, তার মতো শৃঙ্খলিত পেসার খুব একটা পায়নি। অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস, তার ক্যারিয়ার থেমে গেছে মাত্র নয় টেস্টেই! তাতে দায় কতটা বিসিবির, দায় কতটা তার নিজের, আর কতটা দুর্ভাগ্য, সে আলোচনা অন্যদিনের জন্য তোলা থাক। আমরা বরং আলোচ্যে চোখ রাখি।

 

রঙ্গমঞ্চ— হারারে স্পোর্টস ক্লাব, হারারে, জিম্বাবুয়ে। আঙিনা— টেস্ট ক্রিকেট। প্রতিপক্ষ— জিম্বাবুয়ে। সময়কাল— এপ্রিল, ২০১৩।

বছর কয়েক আগের জিম্বাবুয়ে সফরে একমাত্র টেস্টটা হেরেছিল বাংলাদেশ। ছয় বছর পর টেস্ট ক্রিকেটে ফেরা জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশকে পরাজয়ের ‘লজ্জা’ উপহার দিয়েছিল সেবার। ওডিয়াই সিরিজও হারতে হয়েছিল। এসবের জের ধরে সাকিব আল হাসানকে অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিল বিসিবি। বাংলাদেশের জন্য জিম্বাবুয়ে সফর কতটা কঠিন পরেরবার মুশফিকুর রহিমও হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারেন। প্রথম টেস্টেই বিশাল ব্যবধানে পরাজয়। দুই টেস্টের সিরিজ হওয়াতে মুশফিকুর রহিমের সুযোগ ছিল সমতা আনার। রবিউল ইসলাম দুই টেস্টেই উপহার দেন দুর্দান্ত পেস বোলিং। লাইন, লেংথ, সুইং, গতি আর সঙ্গে আগুন। অধিনায়কের যখন প্রয়োজন তখনই তিনি সাড়া দিয়েছেন অকপট। ওভারের পর ওভার একটানা বোলিং করে গেছেন। অনভিজ্ঞ বোলিং লাইন-আপে অধিনায়কের একমাত্র স্বস্তি যেন— রবিউল ইসলাম। প্রথম টেস্টে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হলেও রবিউল জিম্বাবুয়েকে কাঁপিয়ে দেন বারবার।

প্রথম ইনিংসে প্রথম ঘন্টার পর দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই জিম্বাবুয়ের ইনিংসে রবিউলের বজ্রপাত। ২৫৫ রানে এগিয়ে থাকলেও ফলোওন না-করিয়ে ব্যাটিংয়ে জিম্বাবুয়ে। আর নতুন বল হাতে রবিউলের রুদ্রমূর্তি ধারণ। প্রথম স্পেলে একটানা আট ওভারে ১৫ রান দিয়ে ৪ উইকেট। ২৭ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে কম্পমান জিম্বাবুয়ে, পঞ্চম উইকেটে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা করলে, দ্বিতীয় পালায় ফিরে আবার রবিউল-আঘাত। পরপর দুই বলে দুই উইকেট। ছয় উইকেটের ছয়টিই রবিউলের ঝুলিতে। তারপর ব্রেন্ডন টেলরের অতিমানবীয় ব্যাটিং, এবং অন্য প্রান্তের বোলারদের নির্বিষ বোলিং, দুইয়ে মিলে জিম্বাবুয়ের লীড বাংলাদেশের সাধ্যের বাইরে পাড়ি দেয় যদিও!

 

কিন্তু পরের টেস্টে রবিউল আর পরাজিত দলে নেই। গুড লেংথ ডেলিভারি, আউট সুইং, মাঝে মাঝে ইনসুইঙ্গিং ডেলিভারি এবং বুক বরাবর শর্ট বল; প্রায় প্রতিটি বলই জাগায় উইকেট প্রাপ্তির সম্ভাবনা। অস্বস্তিতে ব্যাটসম্যান, অল্পের জন্য ব্যাট ছোঁয় না, এজ হলেও ক্যাচ হয় না, বা একটুর জন্য প্যাড মিস করে যায়, কখনো ইঞ্চির হেরফেরে স্ট্যাম্প মিস। পেস বোলিংয়ের সুন্দরতম উপস্থাপনা। রবিউল যেন সুদক্ষ কোনো শিল্পী, এক-একটি তুলির টান দিচ্ছেন— প্রতি টানে উত্তেজনা, আর সৃষ্টি করছেন মনোমুগ্ধকর কোনো চিত্র।

সিবান্দা বা চাকাভা কারোরই এড়ানোর উপায় থাকে না। বাধ্য হন উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে। পেস বোলিংয়ের উপভোগ্য একটি ঘন্টা দর্শককে উপহার দেন রবিউল। জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং যখন দিশে পেয়ে কক্ষপথে উঠে গেছে মনে হয়, ঠিক তখন নতুন বল হাতে আবারো ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত রবিউল। দুই সেট ব্যাটসম্যান মুতাম্বামি ও চিগুম্বুরা দুইজনকেই ফেরান পরপর দুই ওভারে। খানিক পর শিঙ্গিরাই মাসাকাদজাও। পূর্ণ হয় টানা দুই টেস্টে ফাইফার।

 

পূর্ণাঙ্গ একটা সিরিজে একজন বাংলাদেশী ফাস্ট বোলারের এইরকম দাপট, বোলিংয়ে এমন আগুন, প্রতি মুহূর্তে বা প্রতি বলে অমন সম্ভাবনা— বাংলাদেশ ক্রিকেটে বিরল দৃশ্য। সেই সিরিজে প্রায় এক তৃতীয়াংশ ওভারও করেছেন রবিউল। ওভারের পর ওভার করে গেছেন ক্লান্তিহীন। পুরষ্কার স্বরুপ সিরিজ সেরার পদক পেলেও, রবিউল বাংলাদেশ ক্রিকেটকে যা উপহার দিয়েছেন তার তুলনায় ‘সিরিজ সেরার স্বীকৃতি’ খুব কমই।

আগুনে গদ্যের এই উপাখ্যানে তাকে রাখতে পেরে আমরা কৃতজ্ঞ।

****

 

তৃতীয় ও শেষ পর্বে বাকি দুইটি স্পেল নিয়ে আলোচনা করবো আমরা।