• ফুটবল

জোগো বনিতো একটা মিথ ?

পোস্টটি ১৩৯৪ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

সুন্দর ফুটবলটা বস্তুটা আসলে কী? এটা কী সোনার পাথরবাটি , তিব্বতের ইয়েতি নাকি পুরাণের ইউনিকর্ন ? আরও সহজ করে বলি, এটা খায় না মাথায় দেয় ? ব্রাজিলের ফুটবলার দিদি ও স্টুয়ার্ট হলনামের একজন টিভি উপস্থাপকের মাথা থেকে প্রথম "জোগো বনিতো" শব্দ দুইটি বেরিয়েছিল। এরপর আমাজন, লাপ্লাটায় কত জল গড়িয়েছে, জোগো বনিতো শব্দ দুইটি এখন হয়ে গেছে ফুটবল পুরাণের অংশ। ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবলের জন্যই এটা বেশি খাটে, কিন্তু কোনো দল সেরকম চোখধাঁধানো ফুটবল খেললেই তাদের নামের সঙ্গে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। "আহা, কী ফুটবল, দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল" - যুগে যুগে জোগো বনিতো দেখে উচ্ছ্বাসে ভেসে গেছেন আমাদের বাবা, তাঁর বাবা, তাঁর বাবা... । আচ্ছা, এতক্ষণ তো ভাবার সুযোগ পেলেন । আগের কথায় ফিরে আসি, সুন্দর ফুটবলের সংজ্ঞাটা কী ?

সোজাসাপ্টা উত্তরটা দিলে এরকম দেওয়া যায়, " যাহা দেখিতে ভালো লাগে তাহাই সুন্দর ফুটবল"। কিন্তু এটা তো খুবই ভাসাভাসা কথা হলো। চোখের দেখায় তো কত কিছুই ভালো লাগে। যার গোলাপ ভালো লাগে তার রজনীগন্ধা ভালো নাও লাগতে পারে। আবার এমা ওয়াটসনকে স্বপ্নে দেখলে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্টকেই বা দেখা যাবে না কেন? কিন্তু সুন্দর ফুটবল কি শুধুই মনোমুগ্ধকর পাসের প্রদর্শনী ? সুন্দর ফুটবল মানেই কি ছোট ছোট পাসে ছড়িয়ে থাকা নান্দনিকতার ক্যানভাস ? জমাট রক্ষণ, বলের জন্য হাড্ডহাড্ডি লড়াই, গোললাইন থেকে ডিফেন্ডারের ক্লিয়ারেন্স, গোলকীপারের উড়ে গিয়ে দুর্দান্ত সব সেভ- এগুলো কি শুধু ছ্যা ছ্যা করার জিনিস ? এর মধ্যে কি কোনো সৌন্দর্য নেই ?

ব্যাপারটা আসলে আপেক্ষিক। জোগো বনিতোর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মোটা দাগে সবাই একটা দলের কথাই বলেন। ১৯৭০ সালের পেলে, জেয়ারজিনহো,টোস্টাও, কার্লোস আলবার্তোদের ব্রাজিলকে সর্বকালের অন্যতম সেরা দলই বলা হয়। সেই দল আদতে চার ডিফেন্ডার নিয়ে খেললেও কার্লোস আলবার্তো ও এমারেলদো কিন্তু মোটামুটি উইংব্যাকই ছিলেন। রক্ষণটা তাই কমবেশি অরক্ষিতই থাকত। এক গোল খেলে দুই গোল দেব-মোটামুটি এই মন্ত্র জপেই মাঠে নামত ব্রাজিল। সেজন্যই ছয় ম্যাচে সাত গোল খেয়েও ব্রাজিল ১৯ গোল দিতে পেরেছিল।

অথচ এখনকার কথাটা একবার চিন্তা করুন। নেইমার, অস্কারদের ব্রাজিলের কথাই ধরুন, বা মেসি-আগুয়েরোর আর্জেন্টিনা, এই সময়ে এসে অত গোল দেওয়ার কল্পনা করাটাও বাতুলতা। আর্জেন্টিনার উদাহরণটাই একটু খোলাসা করি। মেসি, হিগুয়েইন,ডি মারিয়া, আগুয়েরো- তাদের আক্রমণকে বিশ্বের সেরা হিসেবে রায় দিয়ে দেওয়া যায়। সেই আক্রমণ নিয়ে এখন আর্জেন্টিনা কতটি গোল করেছে? আঙুল গুনেই বলে দিতে পারেন, আটটি। অথচ যে রক্ষণ নিয়ে এত কথা হচ্ছিল, তারাই কিন্তু দুর্দান্ত করছে। কে জানে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে হলে সামনের দুই ম্যাচে হয়তো কোনো গোলই আর দিতে হবে না তাদের। স্পেন কিন্তু গতবার আট গোল করেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। 
তুলনামূলকভাবে ব্রাজিলের রেকর্ডটা বেশি উজ্জ্বল, দশটি গোল করেছে। কিন্তু কেউ মনে হয় তর্ক করবেন না ব্রাজিলের জন্য ফ্রেড, অস্কাররা যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এখন লুইজ, থিয়াগো সিলভারা। কে জানে, আর কোনো গোল না খেয়েই হয়তো ব্রাজিল হয়তো চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে!

"ইনভার্টিং দ্য পিরামিড" বইতে জোনাথন উইলসন ফর্মেশনের বিবর্তন দারুণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। একসময় যখন এগার জনের দলে মাত্র একজন ডিফেন্ডার ছিল, সেখান থেকে সংখ্যাটা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত চারে। শুধু এভাবে বললে আসলে পুরো চিত্রটা পরিষ্কার হয় না। আক্রমণের পাশাপাশি এখন রক্ষণে সাহায্য না করলে দলে আপনি কল্কে পাবেন না। ফুটবলীয় ভাষায় ট্র্যাকব্যাক না করলে কোচ আপনাকে ছুঁড়ে মারতে কিছু মাত্র কসুর করবেন না। আজকের যুগে তাই আক্রমণে যতজনই থাকুক, রক্ষণে কিন্তু এগারজনকেই সাহায্য করতে হয়!

২০১২ সালে চেলসির চ্যাম্পিয়নস লিগ রূপকথার পর ইয়োহান ক্রুইফ বলেছিলেন, "এভাবে খেলে জেতার চেয়ে বরং হারা ভালো।" ব্যাপারটা কি আসলেই এতো সরল ? চেলসি যেভাবে জিতেছে সেটা চোখের জন্য দৃষ্টিসুখকর বলার উপায় নেই। কিন্তু তাদের জয়কে কি এতো সহজে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় ? ২০০৪ ইউরোতে গ্রিসের সেই অবিশ্বাস্য জয়েরপর তো তাদেরকে কম সমালোচনা সইতে হয়নি। সেট পিস থেকে হেড করে গোল- অটো রেহাগেলের রেসিপি ছিল ধরাবাঁধা। কিন্তু সীমিত সামর্থ্য নিয়েও ট্যাকটিকসটা দারুণভাবে প্রয়োগ করে দেখানোর জন্য তাঁর কি কোনো প্রশংসা প্রাপ্য নয় ? টেলে সান্তানার ব্রাজিল সৌন্দর্যের সাথে কোনো আপস করেনি ঠিক। ১৯৮২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সেই হার এখনও ট্র্যাজেডি হয়ে আছে। কিন্তু দিন শেষে রেকর্ডবুকের পাতা কিন্তু রেহাগেলকেই মনে রাখবে, সান্তানাকে নয়।

সান্তানার কথা যখন উঠলই,ব্রাজিলের ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক। এরপর আরও দুইবার বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল, কিন্তু ঠিক মন ভরানোর মতো খেলা কি কোনোবার খেলতে পেরেছে ? ২০০২ সালে স্কলারি যে কৌশলে জিতিয়েছিলেন,এখন তো সেটা থেকে একটু হলেও সরে আসতে হয়েছে তাঁকে। এই ব্রাজিল যতটা না নেইমারের, ততটাই কিন্তু সিলভা-লুইজদের। শুধু ব্রাজিল কেন, আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।  আর্জেন্টিনার মূল ভরসা ছিল মেসি-ডি মারিয়া-আগুয়েরো- হিগুয়েইন চতুষ্টয়। বিশ্বকাপ জিতলে সবাই মেসির নামই আগেব বলবে, কিন্তু তাতে কি গ্যারাই-রোহো-দেমিচেলিস-জাবালেতাদের কৃতিত্ব এতটুকু কমে যাবে ? ২৪ বছরের মধ্যে যেটা করতে পারেনি, এবার তো দুর্দান্ত রক্ষণের জন্যই সেটা করতে পারল। অথচ আগের কয়েকবারের তুলনায় এই আর্জেন্টিনার খেলা মোটেই দৃষ্টিসুখকর কিছু নয়। তবে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলে কিন্তু এভাবে খেলেই হবে। যে হল্যান্ডকে কেউ গোনায় ধরেনি, তারা এখন শিরোপার স্বপ্ন দেখছে কীভাবে? লুইস ফন গাল সীমিত সামর্থ্য নিয়েও দলকে যেভাবে ট্যাকটিক্যালি সাজিয়েছেন, সেটা যতটা না "সুন্দর ফুটবল", তার চেয়েও অনেক বেশি "কার্যকর ফুটবল"  । একই কথা প্রযোজ্য জার্মানির ক্ষেত্রেও।  "আমরা সুন্দর ফুটবলের সঙ্গে আপস করি না"- এখন বোধহয় কোনো দলই বুকে হাত দিয়ে এই কথা বলতে পারবে না।

এখনতাই "জোগো বনিতোর" নয়, "জোগো এফিকাজ" বা কার্যকরী ফুটবলের যুগ।