• চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    রিওর সেই ছোট্ট মার্সেলিনো

    ছোটবেলায় পছন্দের গাড়ি বিক্রি করে মার্সেলোর ফুটবল অনুশীলন চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন দাদা। ১৮ বছর বয়সে যখন রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ডাক এলো- তখন মাদ্রিদের বিমানে উঠেও মনে করেছেন স্পেন যাচ্ছেন শুধু ট্রায়াল দিতে। সেই মার্সেলো এর পর হয়ে গেছেন রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের অংশ। প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক লেখায় মার্সেলো জানিয়েছেন তার জীবনের গল্পটা। প্যাভিলিয়নের পাঠকদের জন্য বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে লেখাটি।


    ২০১৮ সাল চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল। লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচের ঠিক আগে ড্রেসিং রুমে বসেছিলাম আমি। টের পেলাম আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। জোঁকের মতন আতঙ্ক জেঁকে বসছে গোটা শরীরে। বুকে চাপ লাগছিল ভয়ানক, মনে হচ্ছিল ভারী একটা কিছু চেপে বসে আছে। আমি ঠিক বলে বোঝাতে পারব না আপনাদের। এটা ঠিক স্নায়ুচাপ নয়, ফুটবলে স্নায়ুচাপ খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এটা অন্য কিছু।

    আমি সত্যি বলছি আসলেই আমার দম আটকে আসছিল। 

    ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ফাইনালের আগের রাত থেকেই। না পারি খেতে, না পারি ঘুমাতে, কেবল ফাইনালের চিন্তা মাথায় ঘুণপোকার মত বিজবিজ করছে। আমার আবার দাঁত দিয়ে নখ কাটার একটা বদঅভ্যাস ছিল। আমার স্ত্রী ক্ল্যারিস আমাকে নখ কাটতে দেখলেই রেগেমেগে আগুন হয়ে যেত। কয়েক বছর আগে বেশ খাটাখাটনি করে সে আমার এই অভ্যাস ছাড়িয়েছে। মজার ব্যাপার হল, ফাইনালের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি লক্ষ্য করলাম আমার নখটখ সব গায়েব! 

    আগেও বলেছি, একটু আধটু স্নায়ুচাপ ফুটবলে খুবই স্বাভাবিক। আপনি যে হনুই হন না কেন, ফাইনালের আগে যদি আপনার মনে উদ্বেগের ঝড় না বয়ে যায় তবে আমি বলব আপনি রক্তমাংসের মানুষই নন। বিশ্বাস করুন, ফাইনালের আগে আপনার বাথরুমে দৌঁড়াদৌড়ি পড়বেই, আপনি যে-ই হন না কেন।

    আমার জন্য লিভারপুল ফাইনালের আগে এই চাপটা ছিল ভয়াবহ রকমের। আপনারা অনেকে হয়ত একটু অবাকই হচ্ছেন। আমরা তো এর মাঝেই টানা দুইবার চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতে ফেলেছি। আবার মাদ্রিদের বাইরে গোটা বিশ্বই লিভারপুলকেই সমর্থন দিচ্ছে। তাহলে আমার সমস্যাটা কোথায়? এত চাপ কীসের? 

    যখন নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ আপনার সামনে আসবে তখন তার ওজনটাও অমনই হবে। সেই ওজন আপনি হাড়ে হাড়ে টের পাবেন। কিন্তু কোনো এক কারণে সেবারের চাপ ক্রমেই অসহ্যরকমের হয়ে উঠছিল, কী করা উচিত আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একবার মনে হল ডাক্তারের কাছে যাই, পরে ও চিন্তা বাদ দিলাম। ডাক্তার যদি বলেন, এক দিন বিশ্রাম নাও, খেলার দরকার নেই? 

    খেলব না মানে? আলবাৎ খেলব, একশবার খেলব! 

    নিজেকেই যে অনেক প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ছিল আমার। 

    ফাইনালের কিছুদিন আগে রিয়াল মাদ্রিদের একজন প্রাক্তন খেলোয়াড় এক টিভি সাক্ষাৎকারে আমার সম্পর্কে কিছু কথা বলেছিলেন। সেগুলো গেঁথে গিয়েছিল আমার মনে। ফাইনালের ব্যাপারে তার ভাবনার কথা জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেছিলেন,”মার্সেলোর উচিত সালাহর একটা পোস্টার কিনে নিজের ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া। তারপর দিনরাত ওর সামনে পূজা করা।”

    মাদ্রিদে ১২ বছর আর তিনটা চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি জেতার পরও উনি আমাকে এতটা অশ্রদ্ধা করলেন। এমন একটা বক্তব্য আমাকে বসিয়ে দিতে পারত কিন্তু আমি বরং আরো উজ্জীবিত হয়ে উঠলাম। 

    আমি নিজ হাতে ইতিহাস লিখতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম ব্রাজিলের ছোট ছোট বাচ্চারা আমাকে এমন দৃষ্টিতে দেখুক যেমনটা আমি রবার্তো কার্লোসকে দেখতাম। আমি চেয়েছিলাম তারা যেন এই মার্সেলোকে নকল করে তাদের চুল বড় রাখা শুরু করে, বোঝাতে পারছি তো? 

    আমি বসে ছিলাম ড্রেসিংরুমে আমার লকারের সামনে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, দুনিয়াতে কত ছেলেমেয়ে ফুটবল খেলে? কতজন চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলার স্বপ্ন দেখে? কোটি কোটি ছেলেমেয়ে, কোটি কোটি! মাথাটা ঠান্ডা কর ভাই, জুতোর ফিতেটা বেঁধে নাও।

    আমি ভাল করেই জানতাম, একবার কেবল মাঠে নামতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। মাঠে কখনো খারাপ কিছু হওয়া সম্ভব না, অন্তত আমি এভাবেই চিন্তা করি। হয়ত আপনি ভয়ানক গন্ডগোলের মাঝে বড় হয়েছেন, চারপাশে কেবল মানুষের উন্মত্ততাই দেখেছেন। কিন্তু আমি দেখেছি পায়ে বল থাকলেই এসব চিন্তা মাথা থেকে দূর হয়ে যায়। চারদিক চুপচাপ, শান্ত হয়ে যায়।

    শেষ পর্যন্ত যখন মাঠে পা রাখলাম, তখনো আমার নিশ্বাসের সমস্যা হচ্ছিল। আমি নিজেকে বললাম, আজকে রাতে যদি আমি মরেও যাই, তাহলে শালা মরেই গেলাম নাহয়। কী আছে! 

    অনেকের কাছে গোটা ব্যাপারটাই পাগলামো মনে হতে পারে, হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আমার মনের অবস্থা বোঝার আগে আপনার জানতে হবে এই মুহূর্তটার মূল্য আমার কাছে কতোটুকু। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন এই রিয়াল মাদ্রিদ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, এসবই আমার কাছে ছিল রূপকথার আগডুম বাগডুম গল্প! ব্যাটম্যান আর সুপারম্যান যতটা বাস্তব, এই বেকহ্যাম, জিদান, রবার্তো কার্লোসরাও আমার কাছে ততটুকুই বাস্তব। সামনা সামনি এদের দেখা পাওয়া সম্ভব না। কমিক বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা চরিত্রদের সাথে কি হাত মেলানো সম্ভব? এমন হয়? এরা অলৌকিক চরিত্র, তারা বাতাসে হেঁটে বেড়ায়, ঘাসের ওপর ভেসে থাকে। 

     

    ব্যাটম্যান আর সুপারম্যান যতটা বাস্তব, এই বেকহ্যাম, জিদান, রবার্তো কার্লোসরাও আমার কাছে ততটুকুই বাস্তব। সামনা সামনি এদের দেখা পাওয়া সম্ভব না।

     

    এমন না যে এখন সব বদলে গিয়েছে। এখনকার বাচ্চাদের জন্যও ব্যাপারটা এমনই। 

    একটা সত্যি ঘটনা বলি। মাদ্রিদে আমার বাসায় এক ছেলে মালীর কাজ করে। একদিন রবার্তো কার্লোস আমার বাসায় এলেন। আমরা বাইরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, এমন সময়ে ছেলেটা এলো। 

    আমাদের দেখে ছেলেটা পুরোপুরি জমে গেল মূর্তির মত, একেবারে নট নড়নচড়ন।

    আমি ব্যাপারটা হাল্কা করার জন্য বললাম, “ইনি হলেন রবার্তো কার্লোস।”

    ছেলেটার মুখ তখনো হাঁ, সে ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খেতে খেতে কোনমতে বলল, “না! কিন্তু… কীভাবে… আমি… অসম্ভব!”

    কার্লোস এবার নিজে থেকে বললেন,”হ্যাঁ, আমিই। ”

    ছেলেটা একবার রবার্তোকে ছুঁয়ে দেখে নিশ্চিত হল যে ওটা আসলেই রবার্তো কার্লোস! 

    শেষমেশ তার মুখে কথা ফুটল,”রবার্তো! আসলেই রবার্তো!”

    ব্যাপারটা আমাদের জন্য এমনই ছিল, বোঝানো সম্ভব না। 

    প্রথম যখন মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ খেলতে মাঠে নামলাম আর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গানটা লাউডস্পিকারে বেজে উঠল, আমি নিজেকে বলছিলাম, আরে ভাই! একেবারেই তো ভিডিও গেমের মত! এখনই ক্যামেরা ক্লোজ আপের জন্য সামনে আসবে, হাসি চেপে রাখো মার্সেলো… হাসি চেপে রাখো… 

    আমার বাস্তবতাটা এমনই, বুঝতে পারছেন? 

    কয়েক বছর আগে পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য ব্রাজিলে গিয়েছিলাম। যাওয়ার আগে সাথে করে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের একটা ম্যাচ বলও নিয়ে গেলাম। আমার বন্ধুদের সাথে ওখানে একটা ঘরোয়া ম্যাচ খেলা হবে, সেখানে বলটা নিয়ে গেলাম। ওরা মজা করে টুকটাক বলে লাথি দিচ্ছিল। তখন আমি বললাম, "এটা কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের বল, আসলেই।" 

    সবার নড়াচড়া থেমে গেল। তারা বলটার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন চাঁদ থেকে খসে পড়া কোন উল্কাপিন্ড। 

    “ধ্যাত! ফাজলামো!” তারা বলল। 

    তারা সবাই পূর্ণ বয়স্ক লোক। কিন্তু বাচ্চাদের মত তারাও বিশ্বাস করতে পারছিল না যে বলটা ‘আসল জিনিস’। তারা এরপর বলটা ছুঁতেও যেন ভয় পাচ্ছিল, যেন ওটা মহামূল্যবান কিছু, পবিত্র কোন বস্তু। 

    এবার কী কিছুটা বুঝতে পারছেন? রিও থেকে আসা ছোট্ট মারসেলিনোর জন্য পরপর তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার অর্থটা কী? চাপ, চাপ আর চাপ- মিথ্যা বলব না ভাই, আমি আমার অস্থিমজ্জা পর্যন্ত চাপ অনুভব করছিলাম।  

    ফাইনালের আগে যখন আমরা ওয়ার্ম আপ করছিলাম তখনো আমি সুস্থ হতে পারিনি। কিন্তু এরপর আমরা কিক-অফের জন্য সারি বেঁধে দাঁড়ালাম। শত-শত লাইটের আলোয় আমি তখনই সেন্টার সার্কেলে রাখা বলটা দেখতে পেলাম, আর নিমেষেই বদলে গেল সবকিছু। 

    ওইতো পবিত্র ফুটবল, চাঁদ থেকে খসে পড়া উল্কাপিন্ড!  বুক থেকে ভার নেমে গেল, মাথাও ঠান্ডা হয়ে এল। ঐ বলটা ছাড়া জগতে আর কিছু নেই। ম্যাচের কথা খুব বেশি মনে নেই, তবে দুটো ঘটনা খুব স্পষ্ট মনে আছে। 

    আমরা ২-১ এ এগিয়ে তখন, ম্যাচের আর ২০ মিনিট বাকি। এমন সময় বল কর্নারের জন্য বাইরে চলে গেল। আমি নিজেকে বলছিলাম, সালাহর পোস্টার আমার দেয়ালে টাঙাবো, না? ধন্যবাদ ভাই। আমাকে তাতিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। 

    এরপর ম্যাচের ১০ মিনিট বাকি থাকতে আমরা ৩-১ এ এগিয়ে গেলাম। তখন টের পেলাম আমরাই চ্যাম্পিয়ন হচ্ছি। বলটা থ্রো ইনের জন্য বাইরে বেরিয়ে গেল। এক মুহূর্তই আমি চিন্তা করার সময় পেয়েছিলাম, আর… 

    একেবারে সত্যি বলছি ভাই, আমি কাঁদতে শুরু করলাম। মাঠের মাঝেই আমি ফোঁপাচ্ছিলাম। আগে কখনো আমার এমনটা হয় নি।  ম্যাচের পর কান্না? অবশ্যই। ট্রফি তুলে ধরার সময়? হ্যাঁ। কিন্তু খেলার মাঝে? কখনোই না। 

    আমার কান্নার স্থায়িত্বকাল ছিল কেবল ১০ সেকেন্ড, এরপরই থ্রো ইনটা হয়ে গেল। আর আমার মনে পড়ল, শি*! আমার সালাহকে মার্কিং করতে হবে! আমি আবারো কান্না ভুলে খেলায় ফিরে এলাম, ঠিক ছেলেবেলার মত। 

    আমি জানি, একজন অ্যাথলেট হিসেবে আমার রোল মডেল হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু আমরা কেউই সুপার হিরো নই। এজন্যই আপনাদের এত কিছু বলা। এসবই বাস্তব। আমরাও মানুষ, আপনাদের মতই। কেটে-ছড়ে গেলে আমাদেরও রক্ত পড়ে, আমরাও দুশ্চিন্তা করি, ভয় পাই- বাকি সবার মতোই। 

    পাঁচ বছরে চারটা চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি, কিন্তু প্রত্যেকবারই চাপটা ছিল পাশবিক রকমের। আপনারা ট্রফি হাতে আমাদের হাসিমুখের ছবি দেখেন, কিন্তু এর পেছনের গল্পগুলো আপনাদের শোনা হয় না। 

    যখনই আমি ফাইনালগুলোর কথা ভাবি, আমার মাথায় যেন একটা প্রজেক্টরে সিনেমা চালু হয়ে যায়। তবে গোটা কাহিনীটাই দেখি আমি উল্টোদিক থেকে, শেষ থেকে শুরুর দিকে। 

     

    যখন আমি আমার নাতি-নাতনিদের বলব যে আমি রোনালদো, মেসির সাথে একই ঘাসের ওপর,একই মাঠে খেলেছি, তারা নিশ্চয়ই মানতে চাইবে না।

     

    সিনেমা চলতে থাকে, জুভেন্টাসের বিপক্ষে ২০১৭ সালের ফাইনাল। ম্যাচের আগে কাসেমিরো, দানিলো আর ক্রিশ্চিয়ানোর সাথে বসে লাঞ্চ করছিলাম আমি। টু শব্দটিও নেই, সবাই নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছে বা খাবারের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সবার পেটেই বিভিন্ন রকম আওয়াজ করছে কিন্তু তবুও কেউ কোনো কথা বলছে না। ফাইনালের চাপ সবার ওপরই জেঁকে বসেছে। 

    নীরবতা ভাঙল ক্রিশ্চিয়ানো,”গাইজ, একটা প্রশ্ন ছিল। ”

    সবাই তাকালাম, ক্রিশ্চিয়ানো জিজ্ঞাসা করল,”আমি একাই নাকি সবারই ম্যাচের চাপে পেটে সমস্যা হচ্ছে?”

    “সহমত ভাই! আমারও একই অবস্থা!” আমরা সবাই সমস্বরে জানালাম। 

    কেউই হয়ত স্বীকার করত না। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানোও যদি স্নায়ুচাপে ভোগে, তাহলে আমাদের স্বীকার করতে আর দোষ কোথায়? ক্রিশ্চিয়ানো হল বরফশীতল, ইস্পাদদৃঢ়, ঠিক যন্ত্রের মত। আর ফাইনালের চাপে নাকি তারও অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে! 

    মুহূর্তেই চাপটা কেটে গেল, এবং এটা কেবল ক্রিশ্চিয়ানোর পক্ষেই করা সম্ভব ছিল। আমরা ওয়েটারকে ডাকলাম, "ভাই আমাদেরকে পানি দিয়ে যাও। খাবার গলা দিয়ে নামাতে পারছি না!" 

    এরপর হাসিঠাট্টায় বাকি সময়টা কেটে গেল। ম্যাচের জন্য স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে যখন আমরা রওনা হচ্ছিলাম তখন ম্যাচে কী হবে সেটা একদম নিখুঁতভাবে ক্রিশ্চিয়ানো আমাদেরকে জানাল। সে বলল, শুরুতে আমাদের জন্য খানিকটা কষ্ট হবে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আমরা আরাম করেই জিতব। 
    আমার আজীবন মনে থাকবে, ম্যাচের আগেই করা এই ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল। 

    তারপর সে বলল, "জিততে হবে ভাই, আমাদের জিততেই হবে… "

    আমরা জিতলাম। তার ঐ সময়কার চেহারা আমার মনের মাঝে গেঁথে আছে। নাতি-নাতনিদেরও এসব  গল্প গোটা জীবন ধরে শোনানো যাবে। 

    কিন্তু আজ থেকে ৩০ বছর পর যখন আমি আমার নাতি-নাতনিদের বলব যে আমি রোনালদো, মেসির সাথে একই ঘাসের ওপর একই মাঠে খেলেছি, তারা নিশ্চ্য়ই মানতে চাইবে না। তারা হয়ত বলবে, দাদু তুমি বলছ ওরা প্রতি মৌসুমে ৫০টা করে গোল করতে একাই? তোমার মাথাটাই গেছে। দাদুকে ডাক্তার দেখাতে হবে। 

    সিনেমা চলতে থাকে মাথায়, ২০১৬ এর ফাইনাল, অ্যাটলেটিকোর বিরুদ্ধে। গ্রিজমান উইং ধরে দৌড়াচ্ছে, আমি মার্ক করছি তাকে। বল থ্রো ইনের জন্য বাইরে গেল আর ঠিক তখনি আমি গ্যালারি থেকে একটা পরিচিত কন্ঠ্যের চিৎকার শুনলাম। 

    সাধারণত ম্যাচ চলাকালীন সময়ে আমি কোনো আওয়াজ শুনতে পাই না, গ্যালারির দর্শকদেরও ঝাপসা দেখি। আসলে মাঠের বাইরে কিছুতেই তখন মনোযোগ যায় না, এতে চিন্তাভাবনার ফোকাস ঠিক থাকে, চাপটাও তেমন লাগে না। তবে মিলানের ঐ ফাইনালের জন্য সব খেলোয়াড়দের পরিবারকে নিয়ে আসা হয়েছিল, তারা বসেছিল পিচের একদমই কাছে, আমাদের ডাগ আউটের পেছনেই। 

    আমি এর মাঝেই একটা ছোট্ট কন্ঠ্যের চিৎকার একদম স্পষ্ট শুনলাম,”গো ড্যাডি, গো!”

    ওটা ছিল আমার ছেলে এনজো। ঐ মুহূর্তে আমার পায়ের পেশীতে ক্র্যাম্প ধরা শুরু হয়েছিল। আমার ছেলের গলা শুনে আমি সব যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে নতুন উদ্যমে দৌঁড়ানো শুরু করলাম। 

    ম্যাচটা পেনাল্টিতে গড়াল। আমি এখনো স্পষ্ট দেখতে পাই, লুকাস ভাস্কেজ আঙুলের ওপর বল ঘোরাচ্ছিল যেন আমরা পার্কে এমনিই বল খেলছি। লুকাস চুপচাপ ছেলে, তবে বল নিয়ে অনেক কারিকুরি দেখায় সে। আমি মনে মনে তখন ভাবছিলাম, লুকাস পেনাল্টি মিস করলে শালাকে আচ্ছাসে পেটাবো! 

    লুকাস গোল করল, একেবারে ঠান্ডা মাথায়। 

    আমরা শক্ত করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অ্যাটলেটিকোর পেনাল্টি দেখছিলাম। কাসেমিরো হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করছে আর ওদিকে পেপে ফোঁপাচ্ছে। আমি ক্রিশ্চিয়ানোকে বললাম, হুয়ানফ্রান পেনাল্টি মিস করবে আর তোমার কিকেই আমরা জিতব। 

    ঠিক সেটাই হল, ক্রিশ্চিয়ানোর পেনাল্টিতে আমরা জিতে গেলাম। কুড়ি মাইল বেগে ছুটে গেলাম আমি স্ট্যান্ডের দিকে, আমার পরিবারের কাছে। আমার স্ত্রী সন্তানদের আলিঙ্গন করলাম। খুশিতে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম ঐসময়। 

    মাথায় সিনেমা চলতে থাকে, অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষে ২০১৪এর ফাইনাল। ম্যাচ চলছে আর আমি মেজাজ খারাপ করে বেঞ্চে বসে আছি। তবে আমি মনে মনে আমার দাদার একটি কথা বারবার আওড়াচ্ছিলাম। আমার দাদা খুব শক্ত চরিত্রের মানুষ, তাঁর উক্তির জন্য তিনি এলাকায় বিখ্যাত। তিনি যখন ফুটবল খেলতেন তখন তাঁর বন্ধুদের বলতেন, মাঠে যখন নামব তখন মাঠে সবকিছুই দিয়ে আসব। চুল, দাঁড়ি, গোঁফ - সবই! 

    দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে, কোচরা আমাকে কিছু বলার আগেই আমি ওয়ার্ম আপ করা শুরু করলাম। বিবটা চাপিয়ে দৌঁড়াচ্ছিলাম আর নিজেকে বারবার বলছিলাম, এই ম্যাচে যদি সুযোগ পাই তবে মাঠে সবকিছু দিয়ে আসব। আমার চুল, দাঁড়ি, গোঁফ - সব। 

    এক সময় কোচ আমাকে ওয়ার্ম আপ করতে বললেন, কিন্তু আমি তো গরম হয়েই আছি। কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে আমার। ভাই, আমি তো জ্বলছি! 

       
    আজ পর্যন্ত কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি বলতে পারব না ঐ ম্যাচে আমি ভাল খেলেছিলাম কী খারাপ খেলেছিলাম। আমি শুধু জানি আমি মাঠে আমার সবটা দিয়ে এসেছি - আমার রাগ, আমার ইচ্ছে, এমনকী আমার সকালের কফিটা পর্যন্ত! 

    ৯২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড, আমি জানি আপনাদের সবারই ঐ ম্যাচের স্মৃতি এই সময়টাকে ঘিরেই। আমাদের ক্যাপ্টেন, আমাদের লিডার, সার্জিও রামোসের সেই হেড। আমরা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলাম, আমরা হার স্বীকার করে নিয়েছিলাম প্রায় - কিন্তু সার্জিও আমাদের পুনর্জীবন দান করেছিল। 

    কিন্তু আমার মাথার সিনেমাতে কিন্তু এই দৃশ্যটা নেই। 

    আমার সিনেমাতে ঐ ম্যাচের যে দৃশ্য সেটা ম্যাচ শেষে, ড্রেসিং রুমে। আমাদের এক কিটম্যান মানোলিনের সাথে কথা বলছিলাম। সে আমাকে বললো, "মার্সেলো, ৯০ মিনিটের সময় আমরা সবাই টানেলে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন দেখলাম অ্যাটলেটিকোর কিটম্যানরা চ্যাম্পিয়ন লেখা টিশার্ট নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে, উদযাপনের জন্য শ্যাম্পেনও হাতের কাছেই ছিল ওদের।" 

    মানোলিন হাসছিল, তার চোখে আনন্দাশ্রু। আমিও হাসতে হাসতে বললাম, এখন আমার মরে গেলেও কোন খেদ নেই! 

    এই দৃশ্যগুলোই সারাজীবন মনে থাকবে। ট্রফি তো সব কেবিনেটে রয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতিগুলো হৃদয়ে বেঁচে থাকে। 

    পাঁচ বছরে চারটা চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি, কিন্তু প্রত্যেকবারই চাপটা ছিল পাশবিক রকমের। আপনারা ট্রফিটা দেখেন কিন্তু আমাদের চাপটা টের পান না। 

    “আজ হল না, কাল হবে।” না ভাই, রিয়াল মাদ্রিদে এসব চলে না। আজকেই হতে হবে। 

    আমরা জানি গত মৌসুমে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ। আমরা কিচ্ছু জিততে পারি নাই, শূন্য। খুবই বাজে একটা অভিজ্ঞতা কিন্তু তবুও আমি মাথা উঁচু করে চলতে পারি। কারণ আমাদের জয়ের ক্ষুধাটা আবার ফিরে এসেছে, ছেলেবেলায় জেতার জন্য যে উদ্দ্যম বোধ করতাম সেটা আমি আবারও নিজের মাঝে টের পাচ্ছি। 

    ১৮ বছর বয়সে যখন আমি স্পেনে যাওয়ার জন্য প্লেনে চেপে বসেছিলাম তখনো জানতাম না যে আমি রিয়ালে সাইন করতে যাচ্ছি। আমি ভেবেছিলাম হয়ত রিয়াল এমনি আমাকে ডেকেছে, একটু নেড়েচেড়ে দেখবে, ফিজিকাল টেস্ট করাবে, এটুকুই। ঐ যাত্রায় আমার সাথে ছিল আমার ভবিষ্যত স্ত্রী ক্ল্যারিস, আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু এবং আমার দাদা। এই চারজনের বাইরে আমার স্পেনে আসার কারণ জানতেন কেবল আমার বাবা। ব্যাপারটা আমরা চেপে গিয়েছিলাম, শুধু শুধু মানুষকে মিথ্যে আশা দিয়ে লাভ কী? আমার কাছে তো রিয়াল মাদ্রিদ তখনো রূপকথা, আপনাদের তো বলেছিই। প্লেনে ওঠার সময়ে একটা রূপকথার ভিত্তিতে আপনি আপনার পরিবারকে বলতে পারেন না যে, আমি তো রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলতে যাচ্ছি, পরে দেখা হবে! 

    এসব কখনো হয় নাকি? আরে ভাই তুমি স্বপ্ন দেখছ! 

    আমার মনে আছে, ফিজিকাল টেস্টের পর আমি রিয়াল মাদ্রিদের অফিসে বসে ছিলাম, তখন একজন ট্রেইনার এসে আমাকে বললেন, মার্সেলো, আগামীকালের জন্য জলদি করে একটা স্যুট আর টাই কিনে ফেল। আমি বোকার মত তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, স্যুট আর টাই? কিন্তু কেন? 

    কেন মানে? প্রেজেন্টেশানের জন্য, বার্নাব্যুতে স্যুট টাই পরে আসতে হবে। 

    হা হা হা! 

    আমার সামনে আমার চুক্তিপত্রটা ঠিকঠাকভাবে টেবিলে রাখার আগেই আমি আমার নাম সই করে দিয়েছিলাম। মার্সেলো ভিয়েরা ডা সিলভা জুনিয়র, এই নাও! দরকার হলে রক্ত দিয়েও সই করে দিতাম আমি। ৫ বছরের চুক্তি ছিল ওটা, আমি মনে মনে ঠিক করেছিলাম এখানে আমার ১০ বছর থাকতে হবে। ১৩ বছর পেরিয়ে গেল, রিওর সেই ছোট্ট মার্সেলিনো এখনো এখানেই আছে। 

     

    আমি বোকার মত তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, স্যুট আর টাই? কিন্তু কেন? 

     

    আমাকে নিয়ে যারা সন্দেহ করে তাদেরকে আমি জানাতে চাই, আমি কোত্থাও যাচ্ছি না। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি গায়ে  সবচেয়ে বেশি সময় ধরে খেলা বিদেশি খেলোয়াড়ের তকমাটা আমার কাছে বিশাল সম্মানের ব্যাপার। গোটাটাই একটা রূপকথা, একটা অলীক স্বপ্নের মত, এমন হয় নাকি? 

    আমার মনে হয় এখন হয়ত আপনারা খানিকটা বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন। পুরোটা বুঝতে হলে আমি কোথা থেকে উঠে এসেছি সেটা আগে জানতে হবে ভাই। 

    আমার মাথায় এখনো সিনেমা চলছে। শেষ দৃশ্য। আমার বয়স তখন আট। আমাদের হাতে কোনো টাকাপয়সা নেই। আমাকে প্রতিদিন প্র্যাক্টিসে নিয়ে যাওয়ার তেল খরচ আমার পরিবারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। এরকম অবস্থায় আমার দাদা এমন একটা আত্মত্যাগ করলেন যার কারণে আমার জীবনটাই পালটে গেল। তিনি তাঁর শখের ভোকসওয়াগন ভ্যারিয়ান্ট গাড়িটা বিক্রি করে দিলেন। সেই টাকায় বাস ভাড়া দিয়ে তিনি প্রত্যেকটা দিন আমাকে প্র্যাক্টিসে নিয়ে যেতেন। 

    প্রত্যেকটা দিন ১৪০ নাম্বার মুড়ির টিন বাসে গরমের মাঝে গাদাগাদি করে আমরা রিওর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতাম। 

    প্রত্যেকটা দিন, আমি যেমনই খেলি না কেন দাদা আমাকে বলতেন, তুমিই সবার থেকে ভাল মার্সেলিনো। তুমি একদিন ব্রাজিলের হয়ে খেলবে, আমি মারাকানায় তোমার খেলা দেখতে যাব। ঐ ছবিগুলো আমার মাথায় হালের ৪কে ভিডিওর মতই স্পষ্ট, এখনো আমি ঐ বাসের গুমোট গন্ধটা পাই। 

    আমার দাদা তাঁর জীবনটা আমার স্বপ্নের পেছনে খরচ করেছেন। তিনি ফতুর হয়ে যাওয়ার কারণে তার বন্ধুরা প্রায়ই এ নিয়ে তাঁকে খোঁচাতো। তখন তিনি তার শূন্য পকেট উল্টিয়ে তাদের দেখিয়ে বলতেন, দেখ আমার কাছে একটা ফুটো পয়সাও নেই। তাও শালা আমি এত খুশি! 

    তিনি আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন, আমরা ছিলাম বন্ধু। 

    এই কারণেই লিভারপুল ম্যাচের শেষ প্রান্তে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। সব স্মৃতি আমার ফিরে আসছিল, দশ সেকেন্ডেই আমার জীবনের গোটা সিনেমাটা আমি দেখে ফেলেছিলাম। আমি জানি না মাদ্রিদে আমি আর কয় বছর থাকব। তবে আমি এটুকু জানি, যতদিনই আমি আছি ততদিনই আমি মাঠে নিজেকে উজাড় করে যাব, সব দিয়ে দেব মাঠে। যেমনটা আমার দাদা বলতেন, আমার চুল, দাঁড়ি, গোঁফ সব। 

    পর্দার আড়ালে কত কিছু ঘটে তার কিছুই আপনারা জানেন না। আমি আপনাদের গল্প বলছি যাতে আপনারা বুঝতে পারেন আমরা কীভাবে এতদূর এসেছি, কেন আমরা হাসি, কেন আমরা কাঁদি। আমার আরো অনেক গল্প বলার আছে ভাই, এখানেই শেষ নয়। আপনাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে, আসছে আরো গল্প, শীঘ্রই আসছে। 

    তবে যাদের মনে আমাদের ব্যাপারে সংশয় আছে তাদের জন্য একটা শেষ কথা আছে আমার। রিয়াল মাদ্রিদ আবার ফিরে আসবে। কথাটা পোস্টারে লিখে নিজের ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে দিন, দিনরাত পূজা করুন। আমরা আবার ফিরে আসব। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন