• " />

     

    মরিনহো মুগ্ধতায় হাতেখড়ি, এর পর বাড়ি ফেরার লড়াই : আবাহনীর 'সুপার' মারিও

    এ বছর বাংলাদেশের ফুটবলে সবচেয়ে বড় অর্জন ঢাকা আবাহনীর এএফসি কাপের সেমিফাইনালে খেলা। অথচ এর আগে কোনোবারই এএফসি কাপের গ্রুপপর্বই পেরুতে পারেনি আবাহনী। আবাহনীর সাফল্যের কারিগর পর্তুগিজ কোচ মারিও লেমোস। হোসে মরিনহোকে দেখে কোচিং শুরু করেছিলেন যিনি, এখন সিঁড়ি বেয়ে নিজের 'গুরুর' পথে হাঁটতে চান তিনি। তবে লেমোস বেছে নিয়েছেন অন্য রাস্তা। 


    বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম সচরাচর এমন দৃশ্য দেখে না। রেফারির শেষ বাঁশির পর সাদা-শার্ট আর নেভি প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক ডাগআউট ছেড়ে দৌড়ে যাচ্ছেন গ্যালারির দিকে। মে মাসের ভ্যাঁপসা গরমের  সে রাতে গ্যালারিতে ছিলেন কয়েক হাজার সমর্থক। পর্তুগিজ ভদ্রলোক অ্যাথলেটিক ট্র্যাক পেরিয়ে থেমেছিলেন গ্যালারির সামনে গিয়ে। গায়ে জড়ানো বিব খুলে এর পর গ্যালারির সমর্থকদের সঙ্গে উদযাপন করেছিলেন ভারতের ক্লাব চেন্নাইনকে হারানোর আনন্দ।

    তেত্রিশ বছর বয়সী পর্তুগিজ ভদ্রলোক মারিও লেমোস, ঢাকা আবাহনীর কোচ। চেন্নাইনকে হারানোর পর গ্রুপের বাকি দুই ম্যাচ জিতে এএফসি কাপে ইতিহাস গড়েছিল আবাহনী। বাংলাদেশের প্রথম ক্লাব হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠে গিয়েছিল জোনাল সেমিফাইনালে। যাত্রাটা ফাইনাল পর্যন্ত হয়নি। কিন্তু সেমিফাইনালের প্রথম লেগে উত্তর কোরিয়ার ক্লাব এপ্রিল টুয়েন্টি ফাইভকে হারিয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামকে আরও একবার রাঙিয়ে দিয়েছিল লেমোসের আবাহনী। এমন কিছু নিশ্চিতভাবেই আগে দেখেনি বাংলাদেশের ফুটবল।

    ***  

    ২০০৪, ফেরেইরাস, পর্তুগাল।

    হোসে মরিনহো পোর্তোকে নিয়ে ইতিহাস গড়েছেন কিছুদিন আগে। ইউরোপা লিগ জেতার পর এবার তার পোর্তো জিতেছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় পুরস্কার, চ্যাম্পিয়নস লিগ। ফেরারিস পর্তুগালের পর্যটন শহর। গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে এখানে এসেছেন মরিনহো।

    ওই শহরে জন্ম লেমোসের। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক তার। ১৯ বছর বয়সী লেমোস তখন ফেরারিস ক্লাবের হয়ে খেলছেন। মরিনহোর আগমনে পুরো শহর জুড়ে সাড়া পড়ে গেছে ততক্ষণে। মরিনহোর দেখা পেতে ছুটলেন কিশোর লেমোসও। হাতের কাছে যে বই পেয়েছিলেন, সেটাই নিয়েই গিয়েছিলেন।

    প্রথম দেখায় কী বলবেন বুঝে উঠতে না পেরে লেমোস শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সেদিন মরিনহোকে। এর পর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বইয়ে মরিনহোর স্বাক্ষর পাওয়ার পর গোটা পৃথিবীটাই নিজের মনে হয়েছিল লেমোসের। সেই বই এখনও সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন লেমোস। দেবেনই তো, কোচিংয়ে আসার পুরো অনুপ্রেরণাটাই তো যুগিয়েছিলেন মরিনহো!

    মানুষকে আকৃষ্ট করার অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছেন মরিনহো। শারীরিক শিক্ষায় পড়াশুনা শেষ করে, এর পর দোভাষী হিসেবে ফুটবলে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু মেধা আর পরিশ্রমের সমন্বয় তো কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করে না। মরিনহো তাই এর পর হয়ে গেছেন ফুটবল ইতিহাসের সেরা কোচদের একজন।

    ফুটবল ইতিহাসটাই বদলে দিয়েছিলেন মরিনহো। পেশাদার ফুটবল না খেলেও কোচ হিসেবে তার সাফল্য বদলে দিয়েছিল পর্তুগালের হিসাব-নিকাশও। আন্দ্রে ভিয়াস বোয়াস, লিওনার্দো জার্ডিমরা মরিনহোর দেখানো পথে হেঁটেছেন। মরিনহোর বদলে দেওয়া প্রজন্মেরই একজন লেমোস।

    “পর্তুগালে একটা সময় সবাই ফুটবলার হতে চাইত। মরিনহো যেবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতল এর পর থেকে বদলে যেতে শুরু করল সবকিছু। তরুণরা তখন আর ফুটবলার নয়, হতে চাইত কোচ।” - ফুটবল ছেড়ে তরুণ লেমোসের কোচিংয়ে হাতেখড়ির গল্পটা বলছিলেন ঢাকা আবাহনী কোচ নিজেই।

    লেমোসও অনুসরণ করেছেন মরিনহোর পথ। পেশাদার ফুটবল খেলা হয়নি তারও। মরিনহোও অল্প বয়সে বুঝে গিয়েছিলেন পেশাদার ফুটবল তার জন্য নয়। লেমোসও আধ-পেশাদার ফুটবল খেলতে খেলতেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছিলেন। মাঠের খেলার চেয়ে কোচিং তখন মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল লেমোসকে। ২০ বছর বয়সে যখন কোচিং শুরু করলেন, তখন সেটা পরিণত হলো ভালোবাসায়। শারীরিক শিক্ষা কোর্সে ভর্তি  হয়ে গেলেন লেমোসও। এর পর সি, বি শেষ করে ইউয়েফার এ লাইসেন্স নিয়ে থামলেন। কিন্তু পিএইচডি আর শেষ করা হলো না। এর আগেই জীবন নিয়েছে অন্য বাঁক।

    ***


    ববি রবসনের দোভাষী হয়ে কাজ করতে করতে মরিনহো নিজের প্রজ্ঞা জাহির করেছিলেন। রবসনকে চিঠি লিখে ভিয়াস বোয়াসের ফুটবল কোচিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ এসেছিল। লেমোসের জীবনে রবসন আসেননি। তবে রবসন হয়ে এসেছিলেন ফেরেইরাসের ক্লাব প্রেসিডেন্ট।

    পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার সময়ই ফেরারিসের বয়সভিত্তিক দলে কোচিং করাতেন লেমোস। ইউয়েফার ‘এ’ লাইসেন্স পাওয়ার কাজ ততোদিনে প্রায় শেষদিকে। ক্লাব প্রেসিডেন্ট একদিন লেমোসকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ৫ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চাও তুমি? লেমোস সেদিন জবাব দিয়েছিলেন, পর্তুগাল ছাড়তে চাই আমি।

    “আমার সারাজীবন আমি এই শহরেই কাটিয়ে দিয়েছি। এখানের সবাই আমার পরিচিত। এর বাইরে আমার কিছুই জানা নেই। আমার নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বের হওয়া দরকার ছিল আমার। আমি পর্তুগাল ছাড়তে চেয়েছিলাম।”- ধানমন্ডিতে ক্লাব অফিসে বসে পুরনো কথা বলতে গিয়ে কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন যেন লেমোস।

    বয়স যখন ২৪ তখন পর্তুগালের সঙ্গে ইউরোপও ছেড়েছিলেন লেমোস। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে থাইল্যান্ড দিয়ে এশিয়ায় যাত্রা হয়েছিলেন লেমোসের। থাইল্যান্ড গিয়েই এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ফুটবল বাজারের সঙ্গে পরিচয়। তাই নিজেকে প্রমাণের জন্য এশিয়াকেই বেছে নিয়েছেন লেমোস। থাইল্যান্ড থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় তিন বছর কাটানোর পর বাংলাদেশের সঙ্গে পরিচয়।

    ***


    বাংলাদেশের সঙ্গে লেমোসের পরিচয় অদ্ভুত এক সময়ে। জাতীয় দল তখন একরকম নির্বাসনে। দেড় বছর কোনো ম্যাচেও অংশ নেয়নি বাংলাদেশ। ২০১৮ এর শুরুর দিকে জাতীয় দলকে ভেঙে গড়ার নতুন প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বাফুফে। তখন অস্ট্রেলিয়ান কোচ অ্যান্ড্রু ওর্ডের সহকারি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন লেমোস।

    ওর্ডের সঙ্গে বাফুফের সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ৫ মাস পর লেমোসও তাই মালয়েশিয়ার ক্লাব নেগেরি সেম্বিলানের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান মালয়েশিয়ান সুপার লিগে। আবাহনী ম্যানেজার সত্যজিত দাস রুপুর সঙ্গে পরিচয়টা তখনই।

    বছর শেষে আবাহনী যখন নতুন কোচ খুঁজছিল তখন রুপুই আবার লেমোসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বাংলাদেশে। এবার ঢাকা আবাহনীর হেড কোচ হিসেবে। জাতীয় দলে কাজ করার সুবাদে বেশিরভাগ খেলোয়াড়ের সঙ্গেই পরিচয় ছিল লেমোসের। এএফসি কাপ অংশ নেবে আবাহনী, দলও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো- আবাহনীর ডাকে সাড়া দিয়ে তড়িঘড়ি করেই ঢাকায় এসেছিলেন লেমোস।

    বাংলাদেশে অবশ্য ততোদিনে নতুন শক্তির উত্থান হয়ে গেছে। বসুন্ধরা কিংস নতুন উদ্যোমে শুরু করে জাতীয় দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড় দলে ভিড়িয়েছে। লেমোসের কাজ হয়ে গিয়েছিল দ্বিগুণ কঠিন। শেষ পর্যন্ত বসুন্ধরার শক্তির সঙ্গে আর পেরে ওঠেনি আবাহনী। পুরো মৌসুম তাড়া করেও ৫ পয়েন্টে পিছিয়ে থেকে রানার্স আপ হয়ে গত মৌসুম শেষ করেছিল লেমোসের দল।

    ***

    “একজন খেলোয়াড়ের পায়ে গড়ে বল থাকে তিন মিনিট। বাকি ৮৭ মিনিট খেলোয়াড়রা কী করছে সেটাই নির্ধারণ করে দেয় একজন ফুটবলারের মান।” - ইয়োহান ক্রুইফের এই উক্তি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে এই আবাহনী। বিপিএলে আবাহনী সামর্থ্যের প্রমাণ রেখেছে সবচেয়ে বেশি গোল করে। কিন্তু এএফসি কাপের হিসাব তো ভিন্ন। এখানে প্রতিপক্ষ ভারত, নেপালের চ্যাম্পিয়নরা। ভারতের ফুটবল যেখানে মিলিয়ন ডলার বিজনেস, তার বিপরীতে বাংলাদেশ মুদ্রার অন্যপিঠ।

    সেই চ্যাম্পিয়নদের  একের পর এক হারিয়েই দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ক্লাবের খেতাবটা নিজেদের করে নিয়েছে আবাহনী। ৬ ম্যাচে আবাহনী গোল করেছে ১২টি, জিতেছে ৪টি ম্যাচই; আর হার মাত্র একটিতে। সেটাও চেন্নাইনের মাঠে, একমাত্র আত্মঘাতী গোলে। অথচ এই আবাহনীই এএফসি কাপে নিয়মিত খেলার সঙ্গে গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়াটাও অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছিল। সর্বোচ্চ অর্জন ছিল ৪ পয়েন্ট পাওয়া, সেই আবাহনী লেমোসের অধীনে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে উঠে গিয়েছিল সেমিফাইনালে।

    লেমোস জানতেন শক্ত বিদেশী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বল পায়ে রেখে খেলা কঠিন হবে। এফসি কাপে ক্রুইফের সেই দর্শনই রপ্ত করেছিলেন তিনি, “প্রতিটি ম্যাচে আমাদের চেয়ে প্রতিপক্ষের বল পজেশন বেশি ছিল। আমরা ওদের বল পজেশনই দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এমন জায়গা যেখান থেকে গোল করা সম্ভব নয়। ফল দেখুন, আমরা মাত্র একটি ম্যাচে হেরেছি গ্রুপ পর্বে।”

    এমনিতে মানুষ হিসেবে দারুণ আত্মবিশ্বাসী লেমোস। খেলোয়াড়দের ভেতরও সঞ্চার করেছেন নিজের দর্শন। প্রায় প্রতি ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সানডে, জীবনরা আলাদা করে ধন্যবাদ দিয়েছেন লেমোসকে। যে জীবন গোল করতে ভুলে গিয়েছিলেন, তিনিই গতবার লিগে ১৭ গোল করে হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। আর সানডে তো একটু হতাশ হলেই ম্যাচ চলার সময়ই  ডাগ আউটের দিকে তাকিয়ে থাকতেন বারবার। লেমোসের কাজ ছিল প্রেরণা যোগানো। খেলোয়াড় আর কোচের বয়সের পার্থক্য বেশি না। স্কোয়াডের কারও কারও চেয়ে হয়ত বয়সে ছোটও হবেন লেমোস। কিন্তু এক্ষেত্রে গুরু-শিষ্যে সম্মানে ঘাটতি নেই। এই সম্মান অর্জন করে নিয়েছিলেন লেমোস।

    “আমার কাছে জয়টাই আসল। আমি সবসময়ই বলি, আমি কে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, খেলোয়াড়রাই ক্লাবের ছবি। এটা আবাহনী,  যদি আমরা জিতি তাহলে সেটা ক্লাবের জন্য, আর যদি হারই সে দোষ আমার। কারণ আমি  ঠিকমতো কাজ করতে পারিনি।” -এই কথাগুলো আলো ঝলমলে কক্ষে শ’খানেক সাংবাদিকদের সামনে নিয়মিত বলে যান ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর কোচরা। লেমোস সে স্বাদ এনে দিচ্ছেন ধুলোর শহরে, ঢাকার বন্ধুর ফুটবল মাঠে।

    সবচেয়ে বড় ধন্যবাদটা লেমোস হয়ত পেয়েছেন মাসিহ সাইঘানির কাছ থেকে। আফগান ডিফেন্ডার বাংলাদেশে খেলতে এসেছিলেন বসুন্ধরা কিংসের হয়ে। ট্রায়ালের পর বসুন্ধরায় আর সুযোগ হয়নি সাইঘানির। আবাহনী দলে ভিড়িয়েছিল তাকে। সারা জীবন সাইঘানি খেলেছেন জার্মানির তৃতীয়, চতুর্থ পর্যায়ের লিগে। ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় এসে লেমোসের ছোঁয়ায় সেই সাইঘানির বদল এতোখানি হলো যে সেটা আবাহনীর জন্য হয়ে গেল ‘সাংঘাতিক’। ভারতের ক্লাব চেন্নাইন বড় অঙ্কের চুক্তি দিয়ে বাগিয়ে নিয়ে গেল এএফসি কাপে আবাহনী নায়ককে।

    লেমোস অবশ্য এসবই চেয়েছিলেন। কিন্তু এমন সময়ে চাননি।

     


    দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হওয়ার পর সেমিফাইনালে আবাহনীর প্রতিপক্ষ ছিল উত্তর কোরিয়ার চ্যাম্পিয়ন এপ্রিল টুয়েন্টি ফাইভ। নিয়মিত এশিয়া কাপে খেলা ক্লাবটি উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ক্লাব, জাতীয় দলের বেশিরভাগ ফুটবলের ঠিকানা। কাগজ-কলমের হিসাবে আবাহনীর সুযোগই নেই।

    ঘরের মাঠে এপ্রিল টুয়েন্টি ফাইভের সঙ্গে ম্যাচের চারদিন আগে অনুশীলনে আবাহনী কোচ সবমিলিয়ে খেলোয়াড় পেয়েছিলেন ১৪ জন। সাইঘানি তো গেছেনই, নতুন করে ইনজুরি সমস্যাও সঙ্কট তৈরি করেছিল। তখন নতুন দুইজন ডিফেন্ডার দলে ভেড়ালেও এদের মধ্যে একজন আবার কার্ড সমস্যার কারণে বাদ পড়লেন।

    বাংলাদেশে আসার পর রাস্তার জ্যামও এতোখানি ভোগায়নি লেমোসকে। নিজেই জানিয়েছেন, রাগে তখন ফুঁসছেন তিনি। ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনেও অবশ্য এসব কিছু বুঝতে দেননি লেমোস। ম্যাচের দিন দেখা গেল, কৌশলই বদলে ফেলেছেন তিনি। থ্রি ম্যান ব্যাকলাইন, সেটা আবার ট্রানজিশনে ৫ জনের, সঙ্গে মিডফিল্ডেও আনলেন নতুনত্ব। উত্তর কোরিয়ার ক্লাব সেদিন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ভড়কে গিয়েছিল আসলে লেমোসের ট্যাকটিকসের কাছেই। ম্যাচের আগে সম্মানজনক হার যে দলের জন্য সম্মানজনক মনে হচ্ছিল সেই আবাহনী যোজন যোজন এগিয়ে থাকা এপ্রিল টুয়েন্টি ফাইভের বিপক্ষে ম্যাচ জিতল ৪-৩ গোলে।

    ফিরতি লেগে অবশ্য স্বপ্নযাত্রা থেমেছিল আবাহনীর। উত্তর কোরিয়ায় গিয়ে ২-০ তে হেরে এসেছিল দশ জনের দল। সেই এপ্রিল টুয়েন্টি ফাইভ পরে ইন্টার জোনাল সেমিফাইনাল পেরিয়ে খেলেছে এএফসি কাপের ফাইনালে। (পাঠকদের জন্য আরেকটু সহজ করে বললে, ইউরোপিয়ান ফুটবলের ইউরোপা লিগের ফাইনালে খেলার সমান।)

    ***

    চেন্নাইনের বিপক্ষে জয়ের পর ওরকম উদযাপন করবেন সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন লেমোস। বাংলাদেশে এসে তিনি জুভেন্টাস, বার্সেলোনার জার্সি গায়ে চড়িয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের মাঠে ফুটবল খেলতে দেখেছেন। ধর্মের মতো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা অনুসরণ করা লোক দেখেছেন। এখানকার তরুণ প্রজন্মের রাত জেগে চ্যাম্পিয়নস লিগ দেখার কথা শুনেছেন। কিন্তু নিজের দলের খেলার সময় ফাঁকা গ্যালারির সঙ্গে এসব আর মেলাতে পারেননা তিনি। নিজের ভেতরের জেদ চাপিয়ে রেখেছিলেন লেমোস। খেলোয়াড় আর সমর্থকদের ভেতরও সেই জেদের সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন তিনি। লেমোস জানতেন চেন্নাইনকে হারাতে পারলে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার পথে বড় এক ধাপ এগুবে তার দল। এই লেমোসে মরিনহোর ছায়া খুঁজে না পাওয়াটাই বরং কঠিন।

    জেদ সঙ্গে করে নিয়েই আরও একবার নতুন মৌসুম শুরুর আগে আবাহনীর ডাকে সাড়া দিয়েছেন লেমোস। এবারও তার দলের গুরুত্বপূর্ণ দুইজন ফুটবলার তপু বর্মন ও আতিকুর রহমান ফাহাদকে নিয়ে গেছে বসুন্ধরা কিংস। এবার তারা আরও শক্তিশালী। কিন্তু লেমোস সেসব নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না। এএফসি কাপে আবাহনীর সাফল্যের পর বহু লোকের বাহবা পেয়েছেন, সেসব নিয়েও তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে না লেমোস। উলটো বলছেন, আগের মৌসুমে আমি কিছুই জিতিনি, সময়ের সঙ্গে নিজের ট্যাকটিকসের বিবর্তন ঘটাতে না পারলে নিজের উন্নতি হলো কই? এবার তাই সব জিততে চান লেমোস। লড়াইটা তার নিজের সঙ্গেই, নিজেকে প্রমাণ করার। মৌসুম শুরুর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্লাব থেকেও প্রস্তাব পেয়েছিলেন। সেখানে কাজ করলে নিজের কোরিয়ান স্ত্রী আর তিন মাস বয়সী সন্তানের দেখভালও করতে পারতেন। কিন্তু দূরদর্শী লেমোসের কাছে কোরিয়ার ওই কাজের ধরন নিজেকে আরও প্রস্তুত করার জন্য উন্নতির সিঁড়ি মনে হয়নি।  কঠিন পথে নিজেকে প্রমাণ করার রাস্তা বেছে নিয়েছেন তাই তিনি। নিজেই বললেন, থিংস উই ডু ফর লাভ। এই ভালোবাসা ফুটবলের জন্য, কোচিংয়ের জন্য। স্বপ্ন? ইউরোপ ফেরা। নিজ দেশ পর্তুগালেই লেমোসের যাওয়া হয়নিই তিন বছর হতে চলল। যেভাবে পর্তুগাল ছাড়তে গিয়ে ইউরোপই ছেড়েছিলেন, সেভাবে দেশে ফেরার পথে ইউরোপের কোনো ক্লাবে ফিরতে পারলে গল্পের সমাপ্তিটা হবে রোমাঞ্চকর। ঠিক ওই উদযাপনের মতোই। তার আগে একটার পর একটা বাধা পেরুতে হবে মারিও লেমোসকে, হয়ে যেতে হবে সুপার মারিও।