• কনফেডারেশনস কাপ ২০১৭
  • " />

     

    বিয়েলসার চিলির 'লাল বিপ্লব'

    সান্তিয়াগো, চিলি। জাতীয় স্টেডিয়াম স্টাদিও নাসিওনাল। বছর দুই আগে, এমন এক জুলাইয়ের পড়ন্ত বিকেলে এখানেই ইতিহাস গড়েছিল চিলি ফুটবল দল। পুরো দেশটার স্বপ্ন ছিল ওই একটা খেলার মাঠকে ঘিরেই। যত মানুষ, ততো জোড়া চোখ। অধীর আগ্রহ আর উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে একটা জয়ের জন্য। যেন ওই একটা ফুটবল ম্যাচ ছাড়া আর কিছুই নেই চিলিয়ানদের জীবনে। এর আগেও ছিল না কখনও। শুধু একটা ম্যাচ।  

    প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল। গত বিশ্বকাপটা হাতছাড়া করেছে অল্পের জন্য। সে দলের হয়ে খেলেন লিওনেল মেসি। ফুটবল সমর্থকদের কাছে পূজনীয় তিনি। চিলির মানুষও মুগ্ধ হয় তাঁর পায়ের জাদুতে। মেসি তো আর্জেন্টিনার নন, ফুটবলের। জাতীয় দলের হয়ে মেসি কিছু জিতুক- এ চাওয়াটা যেন বৈশ্বিক! কোপা আমেরিকার সেদিনের ফাইনালে চিলির প্রতিপক্ষ তাই আর্জেন্টিনা নয়। মেসিও নন। মহাবিশ্বের সাথে যুদ্ধে নেমেছে চিলি।

    স্টাদিও নাসিওনালে গ্যালারির লাল সমুদ্র আছড়ে পড়েছিল মাঠে। আকাশী-সাদা সেখানে বিবর্ণ। চিলির ঝাঁঝ বুঝতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি আর্জেন্টিনাকে। ফেভারিট হিসেবে খেলতে নেমেছিল তাঁরা। অথচ প্রথম বিশ মিনিটেই চিলির হাই প্রেসিং গেমের কাছে নাস্তানাবুদ আলবিসেলেস্তেরা। আর সাথে গ্যালারি ভর্তি চিলি সমর্থক তো আছেনই। আর্জেন্টিনার কোপা আমেরিকার জয়ের মিষ্টি স্বপ্নটা ঝাল বানিয়ে দিল ওই দুইয়ের সমন্বয়ই। টাইব্রেকারে মেসিদের হারিয়ে ক্লদিও ব্রাভোর হাতেই উঠল কোপার শিরোপা। চিলির ইতিহাসের প্রথম। লাতিন আমেরিকার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে জন্ম হল ফুটবল বিশ্বের নতুন এক পরাশক্তির নাম। চিলি।



     

    এক বছর পর আবারও প্রায়ই একইভাবে আর্জেন্টিনাকে হতাশ করে কোপা আমেরিকা শতবার্ষিকীর ট্রফিটাও জিতে নিল চিলি। এবারের কনফেডারেশস কাপে খেলার টিকেট অর্জন করেছিল অবশ্য ২০১৫ সালেই। বিশ্বকাপের ড্রেস রিহার্সেল টুর্নামেন্টেও এসেও সফল তাঁরা। উঠে গেছে ফাইনালে। সেমিফাইনালে ইউরোজয়ী পর্তুগালকে বিদায় করে দিয়ে। চিলির উন্নতির গ্রাফটা ক্রমপ্রকাশ্য। সাথে গড়ে উঠেছে একটা ফুটবলীয় সংস্কৃতিও! ছোট একটা উদাহরণ টানলে সে কথার প্রমাণ মেলে। রাশিয়ার কনফেডারেশনস কাপে ইউরোপের দল পর্তুগালের সমর্থকই বেশি থাকাটাই অনুমিত ছিল। ঘটল উল্টোটা। পুরোটা সময় মাঠের মতো গ্যালারিতেও পর্তুগাল সমর্থকদের ওপর ছড়ি ঘোরালেন চিলিয়ানরা। অথচ দুই দেশের দূরত্ব কল্পনা করুন! ফুটবলটা পাকাপোক্তভাবেই খেলতে এসেছে চিলি। দু’দিনের জন্য বিশ্বকে চমকে দিতে নয়।

    পৃথিবীর শেষ কোণা বলা হত চিলিকে। পৃথিবীর দক্ষিণের একেবারে শেষের দিকটায় অবস্থান বলে। মানচিত্র দেখে মনে হতে পারে শেষ মুহুর্তে সিদ্ধান্ত বদলে আরও একটা স্বাধীন দেশের জায়গা করে দিয়েছে মানবসভ্যতা। ‘চিলি’ নামটা এখনকার সভ্য মানব সমাজ সৃষ্টিরও বহু পূর্বের। ইনকা সম্প্রদায়ের দেয়া। ইনকাদের অবশ্য ‘অসভ্য’ বললে বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। তাঁদের কতো ভবিষ্যৎ বানীই তো মিলে গেল পরে। তবে ঝাঁঝালো ফুটবল খেলার সম্ভাব্যতা দেখে যে চিলি নামটি আবিষ্কার করেননি তাঁরা- তা তো বলাই বাহুল্য। তাঁদের দোষ দিয়েই বা লাভ কী? মাত্র দশ বছর আগেও এই যুগের মানুষও তো আঁচ করতে পারেনি। ফুটবল বিশ্বে চিলির উত্থানের কথা।

    পেরেছিলেন একজনই। মার্সেলোনা বিয়েলসা। ২০০২ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনার ভরাডুবির পর চাকরী চলে গিয়েছিল যার। সেই বিয়েলসা। চিলি নাকি পৃথিবীর পরিষ্কারতম আকাশে ছাওয়া। তারা দেখার জন্য প্রসিদ্ধ জায়গা। সেই আকাশেই স্বপ্ন বুনেছিলেন সেই ভদ্রলোক। তারা হয়ে আকাশে জ্বলছেন আজকের সানচেজ, ভিদালরা।

    সাফল্যের সাথে জড়িয়ে থাকে নিরন্তর পরিশ্রমের গল্প। সাফল্যে ঢাকা পড়ে সবকিছু। চিলিতে কাটানো বিয়েলসার সময়টাও ছিল তেমনই। কিন্তু আজকের চিলির এই ভীতটা গড়া তাঁর হাতেই।

    ২০০৭ কোপা আমেরিকার শেষ-১৬ তে ব্রাজিলের কাছে আধা ডজন গোল হজম করে বিদায় নিয়েছিল চিলি। পাঁচবারের বিশ্বকাপ জয়ীদের কাছে হারটা হতাশার হলেও, বেদনার নয়। কিন্তু আধ ডজন গোল খাওয়া তো মেনে নেয়ার মতো নয়! খেলার আগের দিন রাতে চিলির ফুটবলারদের পার্টি করে বেড়ানোর খবর প্রকাশিত হয় এর কিছুদিন বাদেই। চিলির প্রতিটি মানুষের কাছে ফুটবলাররা তখন ঘৃণার পাত্র। ওই ঘটনায় টালমাটাল আসলে গোটা চিলির ফুটবলটাই।

    কয়েকদিন আগে চিলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হয়ে আসা হ্যারোল্ড নিকোলস সভা ডেকে দলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন। সাথে দরকার নতুন কোচ। ঢেলে সাজাতে হবে সব। নিকোলসের নিজের পছন্দেই চিলির নতুন কোচ হিসেবে ঘোষণা করা হল বিয়েলসার নাম। তাঁর একটাই আবদার আর্জেন্টাইন কোচের কাছে। দলে ফিরিয়ে আনতে হবে নিয়ম শৃঙ্খলা। ফলাফল থাকবে উহ্য। স্রেফ এটুকুই!

    চুক্তির সময় বিশ্বকাপ নিয়ে বিয়েলসার সাথে কোনো কথাই হয়নি নিকোলসের। আগের ২৪ বছরে মাত্র একবারই বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা পেয়েছে চিলি। আর এই দল নিয়ে পরের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখা তো শুধু বাড়াবাড়ি নয়। সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াও। হোক সে দলের কোচ বিয়েলসা। তাই সে কথা নিজেই এড়িয়ে গেলেন নিকোলস। তাঁর মতো চিলিয়ানদের ভাবনাও ছিল একইরকম।

    বিয়েলসাকে দেয়া হল অফুরন্ত সময়। তাঁর কাছে নেই কোনো উচ্চাশাও। দড়ি দিয়ে বাঁধা কালো ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে চোখ তুলে নিজের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে জানালেন সময়ের নিশ্চয়তা পেয়েই এখানে এসেছেন তিনি।

    এরপর শুরু বিয়েলসার তত্ত্বাবধান। আর্জেন্টাইন এই কোচের কাজ করার পদ্ধতি একটাই। দ্য বিয়েলসা ওয়ে। সুক্ষ্ণ খুঁতও তাঁর চোখ এড়ায় না। মোটা দাগে একজন বিশুদ্ধবাদী। নিজের কাজের প্রতি বিয়েলসার একাগ্রতা অবাক করেছিল স্বয়ং নিকোলসকেও। শুরুতে খেলোয়াড়দের ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ছিল না তেমন কোনো সুযোগ সুবিধাই। জীর্ণই পড়ে থাকত জিম থেকে শুরু করে ওয়াশরুম পর্যন্ত। ছিল না আধুনিক সরঞ্জামও। চিলির কোচের পদ ছাড়ার সময় সেই জায়গাটাকেই আধুনিক এক ট্রেনিং কমপ্লেক্সে পরিণত করেছিলেন তিনি।

    ট্রেনিং গ্রাউন্ডে সবুজ ঘাসের গুণগত মান থেকে শুরু করে আগের রাতে ঝরে পড়া হলুদ পাতার সংখ্যা- কিছুই তাঁর চোখ এড়াত না। থাকতেন কমপ্লেক্সের পাশের এক ছোট কামরায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অল্প কিছু আসবাবের মধ্যে ছিল ফ্ল্যাট স্ক্রিন একটি টেলিভিশন। কাজ শেষে ওতেই সিনেমা নয় ফুটবল দেখে সময় কাটাতেন। বিয়েলসার জীবনে ঝোঁক বলতে ছিল এই দু’টোই। সব বাদ দিলে বিয়েলসার যাপিত দিনগুলো ছিল সন্ন্যাসীদের মতোই। এই ইট-কাঠের কক্ষ থেকেই নতুন করে লেখা হয়েছিল চিলির ফুটবল ইতিহাস। বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল খেলা আর মানসিকতায়। তার ফল চিলি এখন বিশ্বফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি।   

    বিয়েলসা দলের দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিন আগে অবশ্য সুবাতাস দোলা দিয়ে গিয়েছিল চিলির ফুটবলে। সেবার অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে তৃতীয় হয় সানচেজ, ভিদালদের চিলি। এই দুজন ছাড়াও এখনকার দলের গ্যারি মেডেল, আরাঙ্গুইজ, মারুসিও ইসলাও ছিলেন ওই দলেরই সদস্য। বিয়েলসার ইতিহাস বলে তরুণদের ওপর কখনও আস্থা হারাননা তিনি। ডুবতে থাকা এক ফুটবল খেলুড়ে দেশকে নতুন করে গড়তে হত বিয়েলসার। এক ঝাক তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়ও পেয়ে গেলেন সময়মতো। এঁদের দিয়েই গড়লেন নতুন চিলি! সাথে চলতে থাকল বিশ্বকাপ বাছাই ক্যাম্পেইনও।



     

    বিয়েলসার নিবিড় পর্যবেক্ষণ আর হাড়ভাঙ্গা ট্রেনিং চলল নতুন মুখদের নিয়ে। তাতে অবশ্য আপত্তি তুলেছিলেন কয়েকজন! অবশ্য বিয়েলসার চোখ রাঙানির কাছে হার মানতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। পরে বুঝতে পেরে ‘বিয়েলসা ওয়ে’তেই ফিরতে হয়েছিল সবার। আর নিজের শিষ্যদের ভালোবেসেই বরণ করে নিয়েছিলেন বিয়েলসা।   
     
    ‘শুরুতে আমি পুরো মাঠ উদ্দেশ্যহীন হয়ে দৌড়ে বেড়াতাম। খেলা বা ট্রেনিং-কিছুতেই আমার মনোযোগ ছিল না। তিনিই আমাকে শিখিয়েছেন ট্রেনিং কেন দরকার। কীভাবে চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে মাঠে খেলতে হয়। বিয়েলসার সাথে কাটানো দিনগুলোই আমাকে আজকের খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে’- ২০১০ বিশ্বকাপের পর নিজের এক সাক্ষাৎকারে বিয়েলসার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন ভিদাল।

    দলে প্রতিভা ছিল ঠিকই। কিন্তু সমন্বয় ছিল না। ছিল না কোনো শৃঙ্খলা। খেলার ধরনও ছিল নেতিবাচক। শুরুটা তাই ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। আনকোরা দলটা তখনও রপ্ত করে উঠতে পারেনি বিয়েলসার খেলার ধরন। ফলাফল প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠে বাছাইপর্বের হারের পর, ব্রাজিলের বিপক্ষেও হার। এই ব্রাজিলের সাথে তার আগের ৫০ বছর নিজেদের ঘরের মাঠে কখনও হারতে হয়নি চিলিকে। প্রতিপক্ষের উপর নির্ভর করে মাঠে নামত তখন চিলি। ‘নিজেদের খেলা’ বলে আলাদা কোনো ধরণই ছিল না সেই দলে। রীতিমতো চিলির খেলোয়াড়দের কাছে আকুতি করেই পুরোনো ধ্যান ধারণা ছাড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন বিয়েলসা। কনজারভেটিভ মাইন্ডসেটের পরিবর্তন আনতে একরকম জাতির সামনে ভাষণই দিতে হয়েছিল আর্জেন্টাইন কোচকে।

    ট্রেনিং গ্রাউন্ড থেকে শুরু। তরুণ খেলোয়াড়দের সিনিয়র দলে জায়গা করে দেয়া। সেখানে মানিয়ে নেয়া। আর বিয়েলসার খেলার ধরনটা রপ্ত করা। সবকিছুর সমন্বয় যেবার ঠিকঠাক হল, তখনই ইতিহাস গড়ল চিলি। নিজেদের ইতিহাসে প্রথম কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে হারিয়ে দিল আর্জেন্টিনাকে। ২০১০ বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়ার স্বপ্নটা সেদিন থেকে দেখতে শুরু করে চিলিয়ানরা। বিয়েলসা যে সঠিক পথেই এগুচ্ছেন দল নিয়ে এমন একটা আস্থার জায়গায়ও তৈরি হয় খেলোয়াড়দের মাঝে। সেবার আর্জেন্টিনা ছাড়াও ১৯৮০ সালের পর প্রথমবারের মতো জয়ের দেখা পায় প্যারাগুয়ে ও পেরুর সাথেও।  

    ধারাবাহিক সাফল্যে মাত্র তিন বছর আগের সেই ভাঙাচোরা দলই আর্জেন্টিনা, উরুগুয়েকে টপকে জায়গা করে নিল ২০১০ বিশ্বকাপে। দ্বিতীয় হয়ে। শীর্ষে থাকা ব্রাজিলের চেয়ে মাত্র এক পয়েন্ট কম নিয়ে। বিয়েলসাও বনে গেলেন চিলির জাতীয় নায়ক! পাবলো নেরুদা বেঁচে থাকলে হয়ত আস্ত একটা উপন্যাসই বের করে ফেলতেন এই আর্জেন্টাইনের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে!

    বিশ্বফুটবলে চিলি নিজেদের আগমনী বার্তাটা দিয়ে রেখেছিল সেদিনই। একটা সময় নিজের দেশের মানুষেরাই ‘লা রোহা’ বলে ডাকা বন্ধ করে দিয়েছিল চিলি ফুটবল দলকে। তাঁরাই বিশ্বফুটবলে আরও একবার হাজির লাল রঙে রাঙাতে।

    ২০১০ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচের পরই দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করে ফেলে চিলি। হন্ডুরাস ও সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে শুরু হয় স্বপ্ন যাত্রা। শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে ২-১ এ হেরে রানারআপ হয়ে শেষ ষোলতে ব্রাজিলের মুখোমুখি ‘লা রোহারা’। ৩-০ গোলের হারে অবশ্য অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল বিয়েলসার দলকে। বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয়েছিল, কিন্তু উন্নতির ধারাটা বদলায়নি। পরের বিশ্বকাপে এবার স্পেনের বিরুদ্ধে পুরোনো হারের প্রতিশোধটা নেয়া হয়ে গেল চিলির। কিন্তু প্রতিশোধটা চিলির মতোই ঝাল। হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে পড়ল স্পেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে আবারও সেই ব্রাজিল। এবার খেলতে হবে ব্রাজিলের মাঠে। কাজটা আগেরবারের চেয়ে দ্বিগুণ কঠিন। নির্ধারিত সময়ে ১-১ এ শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিলেন সানচেজ, ভিদালরা। অতিরিক্ত সময়ে চিলির নেয়া শট বারপোস্টে না লেগে ফেরত আসলে হয়ত গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত।

    বারপোস্টে লেগে বল ফেরত এসেছিল ঠিকই। কিন্তু দমানো যায়নি চিলির অগ্রযাত্রা। পরের দু’বারের কোপা আমেরিকা জয় তো লাতিন আমেরিকার তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের গল্পই বলে। ২০১৪ বিশ্বকাপসহ, পরের দুই কোপা আমেরিকাতে অবশ্য বিয়েলসা ছিলেন না। কিন্তু না থেকেও ছিলেন তিনি! প্রকাশ্যে নয়, প্রচ্ছন্নে।

    ২০১০ বিশ্বকাপের পরই চিলি জাতীয় দলের কোচের পদটা ছাড়তে চেয়েছিলেন। বিয়েলসার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনেই নেমেই যায় চিলির মানুষজন! সমর্থকদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে যান বিয়েলসাও। কিন্তু বছর ঘুরতেই চিলি ফুটবলের নতুন প্রেসিডেন্ট হয়ে আসেন হোর্হে সেগোভিয়া। এর আগেই অবশ্য বিয়েলসাও জানিয়ে রেখেছিলেন সেগেভিয়া নির্বাচিত হলে, থাকবেন না তিনি। শেষ মেশ সত্যি হল তাঁর মুখের কথাই।

    সাউথ আফ্রিকার বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়ার পর থেকেই চিলির ফুটবলে শুরু হয় এক নতুন বিপ্লব! এর কোনো নির্দেশ ছিল না, না ছিল কোনো নিয়ম! ক্লাবগুলো নিজ থেকেই বিয়েলসার মতো কোচ খুঁজতে থাকে! ব্যাপারটা একসময় এমন দাঁড়িয়েছিল, বিয়েলসার জন্ম শহর রোজারিওর কাউকে পেলেও বোধ হয় তাঁকে চাকরির প্রস্তাব দিয়ে বসতেন ক্লাব মালিকেরা! বিয়েলসার প্রতি এতোটাই অনুগত ছিল চিলির মানুষজন।

    ২০১১ তে যখন চিলি ছাড়েন বিয়েলসা ততোদিনে তাঁর মতাদর্শ অনুসরণ করে গড়ে উঠছে লা রোহার নতুন ফুটবল দর্শন। বিয়েলসা ছাড়ার পরই পথ হারায়  চিলি। মাত্র ছয় মাসের মাথায়ই ছাঁটাই হতে হয় নতুন কোচকে। একবছর পরই ২০১২ তে নতুন কোচের সন্ধানে নামে চিলি।



     

    বিয়েলসা থিওরি মেনে ততোদিনে চিলির লিগে সাফল্যের দেখা পাচ্ছেন আর্জেন্টাইন কোচরা। তাঁদের ভেতর সবচেয়ে সফল হোর্হে সাম্পাওলি। ইউনিভার্সিদাদ ডি চিলিকে নিয়ে গত দু’বার লিগ জিতেছেন এই আর্জেন্টাইন। মনে প্রাণে মানেন বিয়েলসা কৌশল। নিজেকে একজন ‘বিয়েলসিস্তা’ বলে দাবি করেন সবসময়! এমন একজনকেই তো খুঁজছিল চিলি!

    এরপর সেই সাম্পাওলির হাত ধরেই আসতে শুরু করে সাফল্য। আসে শিরোপাও। চিলির কোচ থাকাকালীন খেলোয়াড়দের জন্য একটা পড়াশুনার জায়গায়ও খুলেছিলেন সাম্পাওলি। সেখানে বিয়েলসা ও গার্দিওলা থিওরির ক্লাসটা নিতেন তিনি নিজেই! আর এই দুইয়ের সমন্বয় করেই নিজেদেরকে সেরাদের কাতারে নিয়ে যায় লা রোহারা।   

    বিয়েলসা, সাম্পাওলির পর চিলির হাল ধরেছেন আরেক আর্জেন্টাইন। হুয়ান আন্টোনিও পিজ্জি। দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাসের মাথায় জিতেছেন কোপা আমেরিকা। কাজটা কঠিন ছিল বিয়েলসার জন্য। তিনি ভিত্তি গড়েছেন। আর বাকি দুই বিয়েলসা ভক্ত কোচ তাঁকেই অনুসরণ করে গেছেন। কাজটাও ধীরে ধীরে সহজ হয়েছে আরও। বিপ্লব তো একবারই হয়!  এবারও সেই চিলি উঠে গেছে কনফেডারেশনস কাপের ফাইনালে। গেল বিশ্বকাপের পর থেকেই প্রতি বছর ফাইনাল খেলে যাচ্ছে চিলি! কোনো গ্রীষ্মেই মিলছে না মুক্তি! পরের বছর রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে লা রোহাদের মিছিল দেখলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না! বিশ্বফুটবলের নতুন পরাশক্তি এখন এই দলটাই। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন