• ক্রিকেট

কার্ডিফের অরুণোদয়

পোস্টটি ৮৬৯১ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি তখন । বাসায় সবে নতুন রঙিন টিভি এসেছে । বাংলাদেশের খেলা থাকলে সবাই মিলে টিভি সেটের সামনে বসে পড়াটা প্রায় বাধ্যতামূলকই ছিল সে সময় ।  

প্রথমবারের মত বাংলাদেশ টিমের ইংল্যান্ড সফর । ইংল্যান্ডে তখন সামার সিজন সবে শুরু হয়েছে । তরুণ এক টিম পাঠিয়েছে বিসিবি যাদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৭ -২৫ এর মধ্যে । তখনকার সময় বাংলাদেশ জিততই হাতে গোনা কয়েকটা ম্যাচ । চারপাশে হই হুল্লোড় পড়ে যেত জিতলে, এক একটা জয় মানে ছিল তখন ঈদের মত।  তবে খেলাটা যখন বাংলাদেশের তখন যা কিছুই হোক না কেন অন্তত ভাল কিছুর আশা নিয়ে খেলা দেখতে বসতে হবে এমন একটা শর্ত মন থেকেই চলে আসত ।

ইংল্যান্ড , অস্ট্রেলিয়া , বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় সফর । প্রথম ম্যাচ ছিল বাংলাদেশ আর ইংল্যান্ডের মধ্যাকার । সেদিন আবার ছিল স্কুলে শেষ পরীক্ষা । তো পরীক্ষা শেষ করার আনন্দ নিয়ে বাসায় এসে টিভি খুললাম । এ কি অবস্থা । এ তো দেখি খারাপের চাইতেও খারাপ । মার্কস ট্রেসকোথিক এর হান্ড্রেড আর স্ট্রাউসের ৮২ রানেই খেলা শেষ । একটা উইকেটও নিতে পারে নি বাংলাদেশ । পুরাই ভরাডুবি যাকে বলে । পরীক্ষা শেষের আনন্দ কোন ফাঁকে যে উড়ে গেল টেরই পেলাম না ।

পরদিন কোন খেলা ছিল না । ছোটবেলায় একটা অভ্যাস ছিল পরীক্ষা শেষ করে এসেই নানার বাড়ি যেতে হবে । তো সেদিন বসে বসে ভাবছিলাম আজকে যাব কিনা কারণ তখনও নানার বাড়িতে টিভি ছিল না । যাই হোক পরে বহু চিন্তা করে ঠিক করলাম পরদিন খেলা দেখেই যাব ।

পরদিন টিভি চালু করেই বসে পড়লাম খেলা দেখতে । শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল আজকে কিছু একটা হইতে পারে।  অনেকটা ঝড় আসার আগে পশুপাখিরা টের পায় যে সেরকম আরকি যদিও আগেও অনেক দিনই এরকম মনে হইছিল কিন্তু দেখা গেছে শেষমেশ কিছুই হয় নাই । শুরুতেই মাঠ সম্পর্কে আলোচনা চলছিল । বলছিল যে এই মাঠে ভাল রান    সম্ভব । অস্ট্রেলিয়া ক্যাপ্টেন রিকি পন্টিং আর বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন হাবিবুল বাশার চলে এল টস করতে ।

ভোরের সূর্য আমাদের পক্ষে গেল না । টসে জিতে অস্ট্রেলিয়া ক্যাপ্টেন রিকি পন্টিং ব্যাটিং এর সিদ্ধান্ত নিল । গিলক্রিস্ট - হেইডেন ব্যাটিং জুটি । ঝড়ের শুরুটা ভাবলাম সেখান থেকেই হয়ত শুরু হয়ে যাবে । কিন্তু না । মাশরাফির দ্বিতীয় বলেই এলবিডব্লিউর শিকার গিলি।

ক্রিজে নামল পন্টিং । শুরু থেকেই পন্টিংকে কেমন যেন নড়বড়ে মনে হচ্ছিল । ষষ্ঠ ওভারে যখন পন্টিং এলবিডব্লিউর শিকার হল তখনই মনের কোণে একবার উঁকি  দিল অঘটনটাকি তাহলে সত্যিই হচ্ছে ।

না এর পরেই শুরু হয়ে গেল হেইডেনের ঝড়ো ব্যাটিং । তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ি হতে পারে নি । ১৭ বছরের নাইমুলের বলে আউট হলেন হেইডেন ।

ভাবলাম এবার হয়ত কিছুক্ষণ পরই টপাটপ উইকেট পড়া শুরু হবে । কোথায় কি উল্টো ক্লার্ক আর মার্টিন মিলে গড়ে তুলল বিশাল এক জুটি । কিন্তু আশার বিষয় ছিল রান রেট খুব বেশি ছিল না । কিন্তু সে আশায় প্রলেপ লাগালো মাইক হাসি আর সায়মন ক্যাটিচ । শেষের দিকে তাদের ঝড়ো ব্যাটিং এ রান গিয়ে ঠেকল ২৪৯- ৫ এ

বিরতির পরই ব্যাটিং এ নামল বাংলাদেশ । জাবেদ ওমর বেলিম আর নাফিস ইকবালের ওপেনিং জুটি । অপর প্রান্তে বোলিং এ ম্যাগ্রাথ । নিজের দ্বিতীয় বলেই চার মেরে তাকে স্বাগত জানালেন নাফিস ইকবাল । কিন্তু ওই স্বাগত জানানো পর্যন্তই । ষষ্ঠ ওভারে গিলেস্পির বলে গিলক্রিস্টের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হয় নাফিস ইকবাল । কপালে হাত । মন বলে হবে না । তাও জোর করে নিজেরে বুঝাই হবে হবে ।

সেই দ্বিধায় আবার ঘি ঢালল তুষার ইমরান । হজের বলে ক্যাচ দিয়ে দ্রুতই আউট হয়ে গেল সে । বিশ্বাসের আর খুব বেশি অংশ বাকি নাই ।

ক্রিজে তখন আশরাফুল আর জাবেদ ওমর বেলিম । ৭২ রানের সময় বেলিম যখন হেইডেনের কাছে ক্যাচ দিয়ে আউট হন তখন প্রায় কেঁদেই দিচ্ছিলাম । ভাবলাম ইনিংস আর কতক্ষণই বা যাবে । হয়ত ১৫০ তেই শেষ ।

এরপরই শুরু হল হাবিবুল বাশার আর আশরাফুলের সেই বিখ্যাত ইনিংস । সত্যি বলতে এমন ধৈর্যশীল ইনিংস বাংলাদেশের হয়ে খুব কমই দেখছি । আস্তে আস্তে আগাতে থাকল তাদের ইনিংস আর এই দিকে আমার বিশ্বাসের পারদও উপরে উঠতে লাগল ।

রান তখন ২০০ পার হল । বলটাকে মিড উইকেটের দিকে পাঠাতে চাইল হাবিবুল বাশার । কিন্তু সেখানেই দারুন ফিল্ডিং করে ডাইরেক্ট থ্রো তে স্ট্যাম্পেও হিট করল । বল স্ট্যাম্প হিট করে একটু সামনে এগিয়ে যাওয়াতে এক্সট্রা রান নিতে গেল বাশার । কিন্তু সেটাই কাল হয়ে দাঁড়াল । কুড়িয়ে নেয়া বল অপর প্রান্তে থ্রো করল গিলক্রিস্ট । আর সেটাকেই রান আউটে পরিণত করল গিলেস্পি ।

যাই হোক খারাপ লাগতে থাকলেও এটাই ভাবতে লাগলাম যে তেমন কিছু হবে না অপর প্রান্তে তো আশরাফুল আছে । দেখুন না এই অল্প কয়েকটা সময়ে কত বিশ্বাস তৈরি করে ফেলল ২০ বছর বয়সী সেই তরুণ আশরাফুল । ইনিংসটাকে তখন আস্তে আস্তে শেষের পথ দেখাচ্ছিল আশরাফুল । ম্যাগ্রার বলে যখন সিঙ্গেলটা তুলে নিয়ে শতক পূর্ণ করে তখন আমার লাফ গুলো দেখে কে

 

          zzzash

 

না আমার লাফগুলো আর বেশিক্ষণ স্থায়ি হতে পারল না । পরের ওভারেই গিলেস্পির বলে ক্যাচ তুলে দিয়ে আউট আশরাফুল । এ কি । তবে কি আমরা হারতে যাচ্ছি ? এগুলোই কেবল ডানা মেলতে লাগল মনে । পরবর্তীতে ফিনিশটা না হলে বোধহয় আশরাফুল সারা জীবন আফসোস করার মত একটা উপকরণ পেত ।

তখনও ২৪ কি ২৫ রানের মত লাগে । হাতে পাঁচ উইকেট । অন্য টিম হলে হয়ত অনায়াসেই তুলে ফেলতে পারত । কিন্তু বাংলাদেশ তো । কেন যেন নার্ভাস আসলে এরা আরও বেশি পা হড়কাত । তাই দুশ্চিন্তা আরও বেশি করে ডানা মেলতে থাকে

মোহাম্মদ রফিক এসেই চার মেরে কিছুটা দুশ্চিন্তা দূরে সরাতে লাগল । তার পর আফতাব আহমেদের সাথে মিলে প্রায় গন্তব্যতে নিয়ে আসলেন ।

শেষ ওভার । ছয় বলে সাত রান দরকার । সমীকরণ টাকে আর বেশি জটিল হতে দিল না আফতাব আহমেদ । প্রথম বলেই ছয় । খেলা ড্র । দ্বিতীয় বলে কাছে টুকে দিয়ে জয়ের রান । একজন একজনকে জড়িয়ে ধরে কান্না ।

আর আমার চিৎকার । মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল কি হইছে ? খালি বাংলাদেশ কথাটা পর্যন্ত বলতে পারছি তখনই দেখলাম বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে । দিলাম সেইদিকে দৌড় ।

                                       430_bangla19

 

স্মৃতিগুলো এমনই যখন সামনে আসে সঙ্গে করে অনেক কিছুকে নিয়ে আসে । ভাল থাকুক সেই সব স্মৃতি আর আমাদের ক্রিকেট ।  

দিক আমাদের এমন কিছু উপলক্ষ যা নিয়ে সারাজীবন গর্ব করতে পারি ।