• ফুটবল

ল্যাটিন আমেরিকানরা ঘরাণায় শুধু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে পারদর্শী

পোস্টটি ২৫৪৬ বার পঠিত হয়েছে

jack-dimmer-victoria-cross


ল্যাটিন আমেরিকান ফুটবলে স্প্যানিশ আমেরিকানের ধারাটি এমনভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে-যা বাংলাদেশী মার্গ সঙ্গীতে অনেক সাদৃশ্য মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। ‘সুপ্রিম টেকনিক এ্যান্ড ইমপোরভাইসেশন শিয়ার ক্রিয়েটিভিটি’-এই জাতীয় জিনিসের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা এবং বলতত্ত্বের অনেক গভীরে উপভোগ করতে হলে আপনাকে ঐ জগতে চলে যেতে হবে। শুধু ফুটবলের উপরিতলের দর্শক হলেই হবে না। কেননা এর ভিত্তি না জানলে আপনার কোনো গ্রহণযোগ্যতাও নেই। বরঞ্চ ল্যাটিন আমেরিকানরা ফুটবল সংগঠনে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সম্পূর্ণ অন্যরকম এবং সেইভাবেই তারা তৈরি করেছে।

অন্য দেশের লোক হলে একটু চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। যেমন-বাংলাদেশী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। এই ধারায় দেখতে পাবেন-শিল্পীদের সরোদের তার বিশেষ একটি গমক এনে ছিঁড়ে যাচ্ছে এবং ঝালা বাজাতে বাজাতে বাজনা থামিয়ে সেতারের তার আবার তাকে এ্যাডজাস্ট করতে হচ্ছে এবং দ্রুত বাজাতে বাজাতে তবলায় হাতুড়ি ঠুকতে হচ্ছে। একজন গায়ক একটি সপাট তান নিতে গিয়ে গলা যায় না বলে থেকে একটু খাকারি দিয়ে নেন। প্রাণবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন, কিন্তু শত চেষ্টাতেও তা পারছেন না। ওটার উপর ছেড়ে দেন এবং তারপর কিছুক্ষণ হয়তো ভেবে নেয়ার সময় নেন-কি করা চাই?

তারপর যখন সফল হলো, তখন শেষমেষ তিনি উপনীত হলেন-যা সুর তরঙ্গের নব আঙ্গিকে সৃষ্টি হয়-নব সৃজনশীলতা। গায়ক বাদকদের সবকিছু ছাপিয়ে যায় এবং শ্রোতামন্ডলীকে সবকিছু কল্পনার জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, এক অপূর্ব সৌন্দর্যলোকে এমনটি ঘটে থাকে। যার কথা হয়তো ভেবেও অনেকে কল্পনা করতে পারেনি। এখানে চরম প্রাপ্তির ক্ষেত্র এই অভাবনীয়টুকুই যথেষ্ট! ফুটবলটাও ঠিক তেমনি...একই প্রতিচ্ছবি...!


এই তো আমেরিকা!
অবশিষ্টগুলো পৃথিবীর এমন কিছু লুপ্ত যোগসূত্রটি পূর্ণস্থাপন করেন নাবিক কলম্বাস নামে এক সাহসী যোদ্ধা। ওয়াইল্ড ওয়েস্টে কারা গিয়েছিল? এ বিষয়ে নতুন করে লিখে জানিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই, ঘটনাটি বিশ্ববাসী অবগত। বিষয়টি এই-কলম্বাসের আমেরিগো ভেস্পুচি’র পথটি। দুর্ধর্ষ স্বভাবের সব স্প্যানিশ, পর্তুগীজ ভাগ্যান্বেষীর দল, তারা সাহসে অতুলনীয়। তারা তাদের নিষ্ঠুরতায় সারা পৃথিবীর ইতিহাসে দারুণভাবে সমৃদ্ধ। ডাকাতের মতো জীবনকে এরা রীতিমত ধর্ষণ করে গেছে এবং তারা পূর্ণতম ভোগ করেছে।

দুরন্ত ল্যাটিন বীজ হাজারো আমেরিন্ডিয়ানদের গর্ভে প্রোথিত হয়েছে। তারা আফ্রিকা হতে সস্তা দামে ক্রয় করে কালো মানুষ এনে কাজে লাগায়। ঐ সমস্ত চারাগাছ তাদের গর্ভেও নিষিক্ত হয়েছে-সাদা, লাল ও কালো এই তিন জাতির সংমিশ্রণে দস্যুপিতার ঔরসে অরণ্য রমণীর গর্ভের সন্তান আজকের ল্যাটিন আমেরিকান সারা পৃথিবী আজও এদেরকে বিপুল বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে-চে গয়েভারা, ফিদেল ক্যাস্ত্রো, মার্কিস বোরহেস, বারাক ওবামা, পেলে, ম্যারাডোনা, গ্যারিঞ্চা, জুনিয়র, সক্রেটিস, কার্লোস ভ্যাল্ডারামা-এদের কাউকে ভিন্ন করা যায় না, আলাদাও করা যাবে না। এদের রোমান্টিক, দুরন্তপনা ও সৃজনশীলতার বদৌলতে শিরা-উপশিরার ধমনী বয়ে আনে-রাষ্ট্রের নাম আমেরিকা। ইউনাইটেড স্ট্যাটস অব আমেরিকা, সংক্ষেপে ইউএসএ।

ভৌগোলিক ভূ-খন্ডে একই পৃথিবীর পরিচয়
মাত্র ৪০০-৫০০ বছর পূর্বের ঘটনা। মানবগোষ্ঠীর কাছে ইউরোপীয় ভূ-খন্ডের এই সুর অজানা। বিশেষ করে সুমেরু, মিশর, এজিয়ান, হোয়াংহো ও সিন্ধু সভ্যতা এবং ১৫০০ শতক পর্যন্ত আফ্রিকার গহীন জনারণ্যেও এক ভূ-খন্ডের কথা প্রকাশ্য জানা থাকলেও ঐ মহা ভূ-ভাগের কথা কারোরই জানার অবকাশ ছিল না। কলম্বাস নামে এক অতি আশ্চর্য পাগল নাবিক যদি জেদের বশে ভুলক্রমে তিনি তরী ভাসিয়ে না দিতেন, তাহলে আজ এ সম্বন্ধে অজানা রয়েই যেতো। সবার অন্তরালে আমেরিগো ভেস্পুচি’র নেপথ্য আবিস্কারের কাহিনী অচেনা থেকেই যেতো।

এশিয়া মহাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণ ও আমেরিকা মহাদেশের উত্তর-পশ্চিম কোণ একে অপরকে প্রায় ছুঁয়ে গেছে। খুবই সরু এক ফালি সমুদ্র রাশি। যা ইউরেশিয়া ও আমেরিকা পৃথিবীর বৃহত্তম দু’টি স্থলাংশকে সামান্য একটু ফাঁক করে রেখেছে। পর্তুগাল হতে হর্ণ অন্তরীপ পর্যন্ত এখনো নির্বিঘেœ যাতায়াত করা যায়, তা না হলে হেঁটেও যাওয়া যেতো না-যদি এ পথের আবিস্কার হতো না। কারণ, বছরের অধিকাংশ ৯ মাস বেরিং প্রণালীতে বরফাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। আমেরিন্ডিয়ানরা পৃথিবীর প্রথম সভ্যতা এভাবেই গিয়েছিল। তখন তারা পূর্ব সাইবেরিয়া, উত্তর মঙ্গোলিয়া বেরিং প্রণালী হতে পেরিয়ে আলাস্কায় চলে আসে। ঐভাবে আমেরিকা মহাদেশে ঢুকে পড়ে।

বরফ অঞ্চল পেরিয়ে ক্রমাগতভাবে নিচে নামতে গিয়ে সেই বনাঞ্চল কেটে-ছেঁটে তারা বসতি স্থাপন করেছে। তারা বহুৎ অমিত সমুদ্রধর নদীপথে পার হয়। বিশাল আকারে যেন মিস্টি পানির হ্রদের ছায়া এবং পূর্ব হতে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে। আরো দক্ষিণে মেক্সিকো পার হয়ে ভূ-মধ্যভাগে চলাচল করা যায় হর্ণ অন্তরীপ পর্যন্ত..। ব্যস! আর যাওয়ার কোনো উপায় নেই, কারণ-সামনেই বিশাল দক্ষিণ মহাসাগর। ইউরেশিয়া মহা ভূ-খন্ডের জটিল ইতিহাসবর্ত হতে এখানেই বিচ্ছিন্ন। ঐ পথে এরপরে আর কেউ যায়নি। এখন সেখানে নিজেদের মতো সাজিয়ে-গুছিয়ে বেড়ে উঠেছে-সেই অন্যরকম পৃথিবী এবং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে গড়ে উঠেছে।

দফায় দফায় সংঘর্ষে স্প্যানিশ ও পর্তুগীজ
নিজেদের সামান্য তুচ্ছ ব্যাপারে স্প্যাানিশ-পর্তুগীজরা ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং এদের উপর পোপ পরবর্তী সীমান্ত ভাগ করে বসিয়ে দেন। ফলে পর্তুগীজরা পায় এক বিশাল অঞ্চল, যা আজ ব্রাজিলকে দেখতে পাচ্ছি। আর অবশিষ্ট সব কিছু স্প্যানিশরা পায়। সেখানে ফরাসি-ইংরেজরা ঢুকে পড়ে। তারা আইন হামবড়া ভাব দেখিয়ে লুণ্ঠন করেছে এবং তাতে স্পেন খুব বেশি কিছু বাধা দেয়নি, কিন্তু ফরাসি-ইংরেজরা এটা-ওটা নিয়ে বিশেষ কিছু মাথা ঘামায়নি।
বিশ্ব ইতিহাসে ফরাসিরা সব সময় ইংল্যান্ড কমপ্লেক্সে ভুগেছে। সবাইকে বাদ দিয়ে ইংরেজরাও ছিল একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। ইংরেজরা শৌর্য-বীর্যে অতুলনীয় ছিল, তারা বিধায় উপনিবেশ দখল করতে দারুণ ব্যাকুল হয়ে পড়ে। তারা বেআইনীকে আইনে পরিণত করতে শয়তানির পরিকল্পনা এঁটেছিল। সঙ্গত কারণে ফরাসিরা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ছেলে মানুষীর মতো আচরণ করেছে বারংবার। যে কারণে মারপ্যাচের জোটে ফরাসিরা সব সময় পিছিয়ে পড়েছে এবং বড় বড় ম্যাগালোম্যানিয়াকরা না বুঝে, না জেনে ঝাঁপ দিয়েছে, ফলে তারা সময়-অসময়ে ব্যর্থও হয়েছে।

আবার বিনা অজুহাতে হা-হুংকার দিয়ে সমানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই কাজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইংরেজরা সব সময় অনবরত বিরক্ত উৎপাদন করে গেছে। তারা অনধিকার চর্চার মাধ্যমে পটভূমিকার ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত সুকৌশলে জিতেছে। ঐ একই ব্যাপারে আমেরিকাতেও ঘটনা ঘটেছে। তবে ফরাসি যতটা উচ্চাভিলাষী মনে করা হয়, তার চেয়ে তারা ততটাও সংগঠিত ছিল না। কিন্তু ফরাসিরা আবার সেখানেও ইংরেজের সঙ্গে জোঁকের মতো লেগেছিল। ইংরেজ দল তাদেরকে হটিয়ে পরাস্ত করে এবং উত্তর আমেরিকায় নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করে নেয়। অবশেষে ফরাসিরা কানাডাকে নিজেদের পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়।
এরপরই আমেরিকায় বসতি স্থাপন করতে শুরু হয়ে যায় দীর্ঘ রক্তাক্তের স্বাধীনতা যুদ্ধ। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ইংরেজ দল যুদ্ধ শুরু করে দেয়। তারা দাবি করে-‘আমরা আমেরিকান জাতি’। এই বলে তারা সদম্ভে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়। যুদ্ধাস্ত্র প্রতিযোগিতায় আমেরিকানরা জেতে। ফলে রাহুমুক্ত হয় কানাডা। পত্তন ঘটে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের, পুরো মেক্সিকোজুড়ে হর্ণ অন্তরীপ পর্যন্ত অধিন্যস্ত বিশাল ল্যাটিন মহাদেশ সৃষ্টি হয়। এক সময়ে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষ হয়। নিঃশর্তভাবে স্পেন ও পর্তুগীজ কলোনী গুটিয়ে নেয়।

 

পর্তুগীজের মায়ের ভাষার টানে
ব্রাজিলীয়রা ভিন্নকৃষ্টির উপর বেড়ে উঠেছে
ব্রাজিলের ভাষা ভিন্ন থাকার সুবাদে ভৌগোলিক দৃষ্টিতে তারা আলাদা স্বতন্ত্র জাতি। কারণ একটাই-ওটা পর্তুগীজ কলোনিয়াল সেশন। সুতরাং পর্তুগীজদের মাতৃভাষা একদম পর্তুগালীয় ভাষা। এমনকি তাদের রক্তমিশ্রণও পুর্তগীজ এবং অবশিষ্ট স্প্যানিশ মাতৃভাষাটির আমদানী ল্যাটিন আমেরিকায় প্রভাবিত হয়, তাও ওদের রক্ত সংমিশ্রণে এখনো সযতেœ লালিত-পালিত হয়েছে এবং এখানো হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে-এতগুলো দেশ টুকরো টুকরো হলো কেন?

এর জবাব এখানেই সন্নিবেশিত করা হলো-একজন নেতার অধীনস্ত সেনাবাহিনী যতোটা অঞ্চলমুক্ত করতে পারতো, ততোটাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নির্বিঘেœ ঘোষিত হতো। যেমন-সাইমন বলিভারের নেতৃত্বে মুক্তি লাভ করে নাম রাখা হয় বলিভিয়া। পাশের অঞ্চলটি হয়তো পরবর্তীকালে অন্য সেনাবাহিনীর মারফত আরেকটি রাষ্ট্র মুক্তি পায়। পরে যে রাষ্ট্রগলো ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা কিন্তু নয়। তার কারণ, প্রাচীন আমেরিন্ডিয়ান সূত্র ও স্থানীয় ডায়ালেক্ট কিছুটা ভিন্ন ছিল। ফলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্র গোড়াপত্তন করা সম্ভব হয়নি।

পর্তুগীজ, ব্রাজিল ছাড়াও স্পেনীয় ভূ-খন্ডে বৃহৎ আকারে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যূদয় ঘটে। ঐ দু’টি রাষ্ট্র হলো-আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকো। এছাড়াও কলাম্বিয়া, বলিভিয়া, পেরু, চিলি, ইকুয়েডর, ভেনিজুয়েলা, উরুগুয়ে, প্যারাগয়ে-এগুলোও কিন্তু নেহায়েত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নয়। তবে মধ্য আমেরিকাতে কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হুন্ডুরাস, গুয়াতেমালা, এলসালভাদর, পানামা প্রকৃত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। আর কিছু দ্বীপরাষ্ট্রও আছে-কিউবা, হাইতি, ডোমিনিকান রিপাবলিক, পুয়ের্টোরিকো। ঐ সব ক’টি দেশে ইংরেজ-ফরাসিরাও ঐদিকে গিয়েছিল এবং কিছু ছোট ছোট দ্বীপ ইংরেজরা হাতিয়ে নেয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জ্যামাইকা ও আশেপাশের মূল ভূ-খন্ডের রাষ্ট্র বৃটিশ গায়ানা। একটু ফ্রেঞ্চ গায়ানা টাইপের ফরাসিরাও ছিল। এক টুকরো দেশ ইংজে ও ফরাসি গায়ানার মাঝখানে খুঁজে পায়, নাম-সুরিনাম। এই হচ্ছে পুরো ল্যাটিন আমেরিকার প্রকৃত ইতিহাসের তথ্য।


এলিস হক
ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার
উপদেষ্টা, বাংলাদেশ লোকাল স্পোর্টস কমেন্টেটর্স এসোসিয়েশন, ঢাকা
২.৫.১৮

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।