• অন্যান্য

কী দিয়া বাঁধিলে মোরে...

পোস্টটি ১৮৭৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

young_tigersনদীর জন্য বিখ্যাত চাঁদপুর। অথচ সেখানে বেড়ে ওঠেও প্রথম নদী দর্শনের সময় বয়স পনেরো পেরিয়েছে। ছোটবেলার ভূবন আটকে ছিল ছোট্ট একটা গ্রামে। ফতেপুর নাম। বেশ ছোটখাটো, অনেক গাছপালা। যার সামনে বিশাল বিল। বছরে মাস চারেক তা ডুবে থাকে পানিতে। বাকি সময় ধান-আলু-ভুট্টা চাষ। ১৫ দিন শামুকে পা কেটে মাস দেড়েক খেলা যায় ফুটবলও।

ক্রিকেটে ভরসা বাড়ির উঠোন। এদিক-ওদিক বিদ্যুতের মিটার। ভয়ে ভয়ে থাকি, এই বুঝি তাড়িয়ে দিল কেউ। এরপর গন্তব্য এদিক-সেদিকের গাছ বাগান। তাও ‘শর্ট বাউন্ডারি’। বল সীমানা দড়ি উড়ে পেরিয়ে গেলে ছক্কা, কিন্তু রানের বদলে তাতে ব্যাট তুলে দিতে হয় অন্যদের হাতে। স্টাম্পের সঙ্গে তুলনা করার মতো শরীর। বাড়ির এই মাথা থেকে ওই মাথা যেতে নাকি বার দশেক হোঁচট খাই তখন।

তাও তার সামনেই একটা ছোট্ট খেলার জায়গা। সেখানে আমাকে নেয়া হয় কেবলই ফিল্ডার হিসেবে। এখন তেমন একটা মনে নেই, তবে দুর্দান্ত ফিল্ডিং করার স্বীকৃতি দিয়েছেন অনেকে। সে জন্যই নাকি নেয়া হতো। তাদেরই কয়েকজনের কাছে ক্রিকেট সম্পর্কে জানা। একদল ভারত, আরেক দল পাকিস্তানের সমর্থক। সে কী ঝগড়া তা নিয়ে!

আমি বাপু সেসবে নেই, বেছে নিলাম শ্রীলঙ্কা। তিলকারত্মে দিলশান, কুমার সাঙ্গাকারা আর মাহেলা জয়বার্ধনের ব্যাট আর রঙিন ঝাঁকড়া চুলের লাসিথ মালিঙ্গাতেই মজে থাকি। এর মাঝেই বিশ্বকাপ এলো। আমার বড় ভাই কোনো কালেই ক্রিকেটতো দূর, কোনো খেলাই খুব একটা বুঝতো না। তবুও সেবার তার একটা নাম একেবারে মুখস্ত। কদিনেই হাজারবার বলে ফেলেছে বোধ হয়, কেউ নাকি তাকে বলেছে দুর্দান্ত ফিল্ডিং করে রিকি পন্টিং। তাই মাঝেসাঝে যখন খেলতে যেত, ব্যস। একটা বল ঠেকালেই ‘আমি রিকি পন্টিং’, ‘আমি রিকি পন্টিং’ চিৎকার। আমার স্মৃতিতে এখনো তা তরতাজা, তার অস্ট্রেলিয়া ভক্ত দাবি করা। তবে তার সেটা ওই বিশ্বকাপ পর্যন্ত, এরপর আর কোনো খেলা নিয়েই আগ্রহের ঝিঁটেফোটা নেই তার।

আমার ছিল। আস্তে আস্তে ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা ছাপিয়ে বাংলাদেশ এলো দৃশ্যপটে। সাদা কালো একটা টিভি ছিল আমাদের। তা গেল নষ্ট হয়ে। এদিক-ওদিক ঘুরি। কাকাদের পেলে বসে থাকি টিভির সামনে। কিন্তু উনারা না থাকলেই বিপত্তি। খেলা কীভাবে দেখা যায়? কারো কারো ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দেই, কারো টিভি বন্ধ, কেউ মুখের ওপরে দেন দরজা বন্ধ করে।

এরপর আমার সে কী কান্নাকাটি। আব্বু তখন সৌদি আরবে থাকেন। শুনেই ফোন দিলেন নারায়ানগঞ্জে থাকা ফুফাকে। তিনি একুশ ইঞ্চি রঙিন টিভি নিয়ে আসলেন। সেটা এখনো আমাদের ওয়ারড্রপের ওপর ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। এখনও সে ছবি স্পষ্ট আমার চোখে। কে যেন টিভি মাথায় করে ঢুকছেন আমাদের বিশাল বড় বাড়ির ছোট্ট ঢুকার জায়গাতে। আমার চোখে মুখে নিশ্চয়ই তখন আনন্দের রেখা স্পষ্ট।

টিভিতো এলো। কিন্তু সমস্যার সমাধান হলো না। কারেন্ট আর থাকে না। থাকলেও একা খেলা দেখতে ভালো লাগে না। ওয়ানডে হলে অনেকে দেখেন, টেস্ট হলে তারা দেখেন না। আমি বসে থাকি মাটিতে, আম্মু ঝাঁড়ি দেন, তাও। তখন তো আর এত ইংরেজি বুঝি না। তবুও শামীম আশরাফ আর আতহার আলীকে চিনি। বাংলাদেশের খেলা এলেই তাদের কণ্ঠ কানে ওঠে।

আমি খেলা দেখি, ওখানেই খাই, দুধ- ভাত নিয়ে চলে এসে টিভির সামনে। আম্মু না করেন। কে শোনে কার কথা। দৌড়ে চলে আসি। বকা দেন, কাজ হয় না। একসময় ক্লান্ত হয়ে আর কিছু বলেন না। সারাদিন টুকটুক ব্যাটিং দেখে তখন ৮-১০ বছর বয়সের আমি কী মজা পেতাম, আজও কাউকে বুঝাতে পারি না।

তবে সবচেয়ে বড় সমস্যাটা অন্য। কারেন্ট তো থাকে না। সারাদিনে দুই কী তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়। আর যদি সোলার মেশিন চালানোর মৌসুম হয়, তাহলে তো কথাই নেই। কী করি? উপায় খুঁজে বের করি। পাশের বাড়ির মহিউদ্দিনের রেডিও আছে। তার কাছে যাই। এদিক-ওদিক রেডিও নিয়ে ঘুরি। সিগন্যাল পায়, আবার পায় না। হাত উঁচিয়ে ধরে রাখতে হয়। কিছুক্ষণ আমি, একটু পর আরেকজন, এভাবেই চলে।

আমি সারাদিন ওখানেই পড়ে থাকি। সন্ধ্যা হলেও। আম্মুকে তখন ভয় পাই ভীষণ। রাগলে ভয়ঙ্কর। হাতের কাছে যা থাকে তাই দিয়ে মাইর। এদিক-সেদিক, আগে পরের কোন কিছু চিন্তায় থাকে না। তাও যেদিন দিবা-রাত্রির খেলা থাকলে আমি সন্ধ্যা পেরোলেও ঘরে ফিরি না। আম্মু খোঁজে বের করেন। কখনো ঝাঁড়ি, কখনো মার। দাদু মাঝে মধ্যে বাঁচিয়েও দেন।

এভাবেই চলে ক্রিকেট নিয়ে পাগলামী। কখনো স্কুল পালিয়ে আজাদ কাকার বাড়ি, কখনো টুক করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে একটু রেডিওতে স্কোর জেনে নেয়া। কেউ কেউ মাঝেমধ্যে আমার ক্রিকেট জ্ঞানের পরীক্ষা নেন- জিজ্ঞেস করেন ‘দশ দলের ক্রিকেটারদের নাম বলতে পারবি?’। ওইটুকু বয়সে যখন আমি ভিনদেশি ভারি ভারি সব নাম বলতে শুরু করি, তারা মুখ লুকায়। আশেপাশের মানুষ মাঝেমধ্যে গর্বও করে। দেলোয়ার কাকা কিংবা অন্য কেউ পাশের বাড়ির কাউকে দেখিয়ে বলেন, ‘বাপ্পীরে জিজ্ঞেস কর, সে পুরো দশ দলের ক্রিকেটারদের নাম বলতে পারে’। বিস্ময়ভরা চোখে তারা অযথাও জিজ্ঞেস করে, আমি বলি বুক ফুলিয়ে।

সে সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। বড়দের খেলা দেখি। এদিক-ওদিক যাই তাদের সঙ্গে। গায়ে শক্তির অভাব, ব্যাটিং বা বোলিং তেমন ভালো পারি না। তাই বড় বড় সব মানুষের খেলার আম্পায়ার বনে যাই কখনো। যেখানে ধারাভাষ্যের সুযোগ থাকে, মাইক্রোফোনও হাতে ওঠে।

ধীরে ধীরে বড় হই। আম্মুর অবাধ্য হয়ে সন্ধ্যায় বাইরে থাকতে বুক কাঁপে না। আলমগীর মামার দোকান, জেনারেটর ভাড়া করে পাশের গ্রামে, সেখানে দৌড় দেই। এরপর ঢাকায় হোস্টেলে ভর্তি হই। সন্ধ্যার পর বাইরে বেড়োনো নিষেধ, মোবাইল রাখাও। আমার ক্রিকেট দেখায় ভাটা পড়ে। একদিন ইচ্ছে হয় খেলা দেখতে যাওয়ার। তাওহীদ কে নিয়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে, বেরিয়ে পড়ি। রাতে মিরপুরে এক বন্ধুর বাসায় থেকে সকালেই টিকিট কিনবো। তখন ২০১৬ সাল। ইংল্যান্ড এসেছে। সাকিব-তামিম-মুশফিকদের সামনে থেকে দেখা যাবে। সে কী রোমাঞ্চ।

ফজরের সময় ওঠে গিয়ে দাঁড়াবো লাইনে। আমার আগে লাইনে কে দাঁড়াবে, শুনি? কিন্তু হায়! তখনো ঠিকঠাক চিনি না। জায়গাটার নাম ইন্ডোর স্টেডিয়াম। একবার ঘুরে এসে ঘুমাবো, এমন মনোভাব নিয়ে গিয়ে দেখি হাজার হাজার মানুষ। কী করা যায়!

ওখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নেই। থেকেও যাই। কিন্তু লাইনের শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়ালে কোনো সম্ভাবনাই নেই টিকিট পাওয়ার। পাশেই একজন টাকা নিয়ে লাইনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমি আর তাওহীদ তার কাছে যাই, টাকা দেই। সে আমাদের শ পাঁচেক মানুষের পেছনে দাঁড় করিয়ে দেন। আমরা দাঁড়াই। পেছন থেকে জোরে ধাক্কা আসে। আমি লম্বা বলে মাথা উঁচিয়ে রাখি, তাওহীদ পারে না। এক পর্যায়ে ছিটকে পড়ি। আবার দাঁড়াই।

মাঝে মিরপুর থাকেন এমন গ্রামের এক ভাই আসেন। আমাকে টেনে বের করে নিয়ে আসতে চান ধাক্কার অবস্থা দেখে। আমি বের হই না। রাত বাড়তেই পরিস্থিতি শান্ত হয়। ঘুমাতে পারি না। রাস্তাতেই বসে থাকি। না ঘুমিয়ে রাত কাটিয়ে খেলা দেখতে পারবো কী না সে চিন্তা একটুও আসে না। সকাল হলেই টিকিট কাটবো, খেলা দেখবো। এই ভেবেই মনে শান্তি। এই তো সামনের এই মানুষগুলো পেরোলেই কাউন্টার। এরপর? টিকিট! টিকিট! সাকিব! তামিম!

কিন্তু ভোর হতেই ধীরে ধীরে ভুল ভাঙে। আমাদের সামনে একটা একটা করে মানুষ ঢুকে, আর হৃদয়ে টোকা লাগে। তবে কী খেলা দেখা হবে না? ভাবতে ভাবতেই বৃষ্টি আসে। ভিজেও দাঁড়িয়ে থাকি। টিকিট লাগবেই। শরীরটা আর চলে না। অল্পকিছু টিকিট দিয়েই কাউন্টার থেকে ঘোষণা আসে, টিকিট নেই। মানে! সারারাত বসে ছিলাম যে! আরে আমরা তো লাইনের আগেই ছিলাম! চিৎকার যেন বেরোয় না ভেতর থেকে। এক পর্যায়ে পুলিশ পানি ছুঁড়ে। মানুষ সব ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

আমি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে পড়ি লাইন থেকে, আম্মুকে ফোন দেই। আম্মু স্বান্তনা দেন। বলেন, যত টাকা লাগে টিকিট কিনে খেলা দেখ। আমি কিছু বলি না। খালি চোখ বেয়ে পানি পড়ে। সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করি, টিকিট কিনে খেলা দেখবো না আর। দেখিওনি।

তাহলে কী খেলাই দেখবো না? তাও আবার হয় নাকি। সাংবাদিক হবো। ফেসবুকের কল্যাণে ততদিনে একটু-আধটু লিখি। বানান ভুল থাকে অসংখ্য, এদিক-সেদিক থেকে ধার করাও থাকে। তবুও, সাংবাদিক আমি হবোই। ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি চলে আসার পর সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

অনার্সে ভর্তি হয়েছি। ক্লাস করি আর মাথা নিচু করে চলে আসি। এক মিনিটও থাকি না। কেউ কেউ টিপ্পনী কাটে। ক্যাম্পাস লাইফের মজা বুঝলি না। সবাই গ্রুপ সেলফি তোলে, ট্যুর দেয়, নতুন নতুন বন্ধুত্বের কথা ফেসবুকে জানায়, আমার তা টানে না।

সাহাদ ভাইকে পাই, কেবল জ্বালাতে থাকি। উনি একদিন দুইটা আর্টিকেল ধরিয়ে দেন, ইংরেজিতে। আতহার আলীর কমেন্ট্রি শুনতে শুনতে ইংরেজি এমনই শিখেছি- ট্রান্সলেটই করে ফেললাম। জাগোর অফিসে ডাকলো। গেলাম। দুটো আর্টিকেল দিলো আবার, ইংরেজিতে। আমার এখনো মনে হয় ঠিকঠাক পারিনি, সাহাদ ভাইয়ের জন্যই বোধ হয় হয়ে গিয়েছিল। জীবনের সেরা দুইটা মাস কাটালাম ওখানে। অসংখ্য সম্পর্ক জুড়ে গেল, সোহেল-সাহাদ-মাহফুজ ভাইদের হাত ধরে লেখায় পরিবর্তন এলো।

এরপর আক্ষরিক অর্থেই সাংবাদিক হয়ে গেলাম। জাগরণে যোগ দিলাম স্পোর্টসে। অনার্স প্রথম বর্ষেই। ওই ঘটনার দুই বছরের মধ্যে। ভয় নিয়ে মিরপুরে যাই। ফেসবুক সূত্রে দু’ চারজনের সঙ্গে পরিচয় আছে। কিন্তু তারা কী আমাকে চিনবেন? কথা বলবেন?

সাংবাদিকের কার্ড দেখালে কেউ দেখি আর কিছু বলে না। গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড, প্রেসিডেন্ট বক্স, প্রেসবক্স সব জায়গাতেই যাওয়া যায়। কাছ থেকে দেখা যায় সবকিছু। সঙ্গে চারপাশের নির্মম বাস্তবতা দেখি। সবাই বলে সাংবাদিকতা ভালো না, সময় থাকতে ছেড়ে দেও। আব্বু সরকারি চাকরি করতে বলে, ভাইও। এ নিয়ে কথা কাটাকাটিও হয়।

আর আমি খালি ভাবি- ‘কী দিয়া বাঁধিলে মোরে?’