• ফুটবল

"টার্বো টিমো"র ছুটে চলা

পোস্টটি ৫৯২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

স্টুটগার্টের এক ছোট্ট শহর বাড কান্সটাট। ছবির মতো সুন্দর জায়গা কান্সটাট – পুরনো কাঠের বাড়িগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সেই কবে থেকে। পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে নেকার নদী। কিন্তু স্থানীয় ফুটবল কোচ গুন্টার শা’র ছোট ছেলেটাকে এসব টানে কিনা কে জানে? হয়তো ছোট্ট টিমোরও ইচ্ছে হয় আলসেমি করে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোতে, বন্ধুদের সাথে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে শান বাঁধানো রাস্তায়  ছুটোছুটি করতে। কিন্তু মা স্যাবিন ভের্নারের হাজার নিষেধ সত্ত্বেও টিমো বাবাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে কাকভোরে। তারপর দু’জনে মিলে পাহাড় বেয়ে ওঠা – নাহ্‌ প্রকৃতিপ্রেম নয়, শরীরটাকে মজবুতভাবে গড়ে তুলতে। দাঁতে দাঁতে চেপে খাড়া পাহাড় বায় টিমো, দু’চোখে ফুটবলার হওয়ার মায়াঞ্জন আঁকা। তরতর করে উপরে উঠে যায় টিমো, এই ছেলেটাই একদিন জার্মান ফুটবলের বড় ভরসা হয়ে উঠল। প্রতিভার সাথে পরিশ্রম যোগ করলে যে কেউ অদম্য হয়ে উঠতে পারে তাঁর জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ টিমো ভের্নার। গতির জন্য সেই ছোটবেলা থেকেই বিখ্যাত “টার্বো টিমো”, ইউরোপের বড় বড় দলের ডিফেন্ডাররা জানলে হয়তো বাড কন্সটাটের পাহাড়টাকে শাপ-শাপান্ত করতেন। “টার্বো” কিন্তু ছুটে চলেছেনই, জার্মানি জয়ের পর এবার লক্ষ্য “মিশন ইংল্যান্ড।”

297A1C7E00000578-0-image-a-121_1433861025238

ভের্নারের বাবা গুন্টার স্থানীয় অপেশাদার “স্টুটগার্ট কিকার্স”-এর হয়ে ফুটবল খেলেছেন, কোচিংও করেন টুকটাক। তাই বুঝতে শেখার পর টিমোর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠল বলটা। বেশ ভালোও খেলে ছেলেটা, কিন্তু আরেকটা ব্যাপার সবাইকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। সেটা টিমোর গতি, চোখের নিমিষে মাঠের এমাথা থেকে ওমাথায় ছুটে যেতে পারে ছেলেটা। গুন্টার অবশ্য ফুটবল খেলাটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার বিরুদ্ধেই ছিলেন, কিন্তু টিমোর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানসিকতার কাছে। বালাক,ম্যাথাউস কিংবা বেকেনবাওয়ার নয়, বেড়ে ওঠার সময় টিমোর আদর্শ ছিল মারিও গোমেজ। স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত এই জার্মান স্ট্রাইকারের শুরুটা স্টুটগার্টের সেরা ক্লাব ভিএফবি স্টুটগার্ট দিয়েই। গোমেজের মতোই স্টুটগার্টের জার্সি গায়ে গটলিব ডেইম্লার স্টাডিওনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে – টিমোর স্বপ্ন অনুমান করতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় না। মা প্রশ্রয় দিতেন আবার পড়াশোনায় মন দেয়ার জন্য বকাঝকাও করতেন। টিমোকে ভর্তি করে দেওয়া হলো স্থানীয় টিএসভি স্টাইনহাল্ডেনফেল্ডে। নতুন ক্লাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে নিতেই আবার ডাক এলো। এবার স্বয়ং স্টুটগার্ট হাজির। ২০০২ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে স্টুটগার্টের একাডেমিতে টিমো ভের্নারকে জায়গা করে দেওয়া হলো। পাহাড়ে যেভাবে উঠতেন সেভাবেই তরতর করে এগিয়ে চলা এরপর। স্বপ্নের সিঁড়িতে একের পর এক ধাপ ভেঙ্গে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চললেন দুর্বার গতিতে। ২০১০ সালে জার্মানি অনূর্ধ্ব -১৫ দলের হয়ে পোল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকেই হ্যাট্ট্রিক। দু’বছর পর স্লোভেনিয়ায় আয়োজিত অনূর্ধ্ব -১৭ ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় জার্মানির হয়ে রানার্স-আপ হলেন। আর স্টুটগার্টের বয়সভিত্তিক দলগুলোর হয়ে গোলের বন্যা তো বইছিলোই। প্রতিপক্ষ রক্ষণ কোনো ভুল করলেই হয়েছে, ব্যস চোখের নিমিষে সেখানে হাজির হবেন টিমো। আর তাঁর বুলেট শটে একাডেমির জালগুলোর দফারফা অবস্থা। সে বয়সেই ১১ সেকেন্ডের কাছাকাছি সময়ে ১০০ মিটার পাড়ি দিতে পারতেন “টার্বো টিমো” চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল সুনাম। স্টুটগার্ট শহরের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ল ভের্নারের নাম। মায়ের গর্ব হচ্ছিল ঠিক, কিন্তু একটি বিশেষ ব্যাপারে একটুকুও ছাড় দিতে নারাজ তিনি। তুমি ফুটবল পায়ে দিগবিজয়ী বীর হও বাপু, এতে আমার আপত্তি নেই; কিন্তু পড়াশোনা যে শেষ করতে হবে আগে। বাধ্য হয়ে অনুশীলনের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা করা ক্লাসে গরহাজির থাকা ছেলেটা পাশ করে বেরিয়েছিল। মায়ের নিশ্চয়ই অনেক গর্ব হচ্ছিল, কিন্তু গর্বের উপলক্ষের সেটা তো কেবল শুরু।

soccer-timo-werner-german-wallpaper-preview

২০১৩ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে স্টুটগার্টের মূলদলে সংযুক্তি। প্রথমদিন থেকেই ভের্নারের পায়ের কাছে একের পর এক রেকর্ড লুটোপুটি খেতে লাগলো। বোতেভ প্লভদিভের বিপক্ষে ইউরোপা লীগের বাছাইপর্বে নেমে স্টুটগার্টের সবচেয়ে কমবয়সী ফুটবলার রেকর্ডটা নিজের দখলে নিলেন। এরপর বুন্দেসলিগা আর জার্মান কাপে স্টুটগার্টের কনিষ্ঠতম ফুটবলারের পর আইনট্রাক্‌ট ফ্রাঙ্কফুটের বিপক্ষে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়ে ওঠা। ঐ বছরেরই নভেম্বরের ১০ তারিখে ফ্রাইবুর্গের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আরেকটি রেকর্ড। তাঁর চেয়ে কম বয়সে যে আর কেউ জোড়া গোল করতে পারেনি। তাঁর গতির সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে গিয়ে জার্মানির ডিফেন্ডারদের নাভিশ্বাস উঠলেও স্টুটগার্টের হয়ে ততোটা বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারেননি ভের্নার। তিন মৌসুমে ১০৩ ম্যাচ খেলে “মাত্র” ১৪ গোল। কিন্তু স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছিল নিজ শহরের ক্লাবেই, এরপর লাইপজিগ এসে কড়া নাড়ল ভের্নারের দরজায়।

jpeg

ক্লাব রেকর্ড ১০ মিলিয়ন ইউরোয় আর.বি লাইপজীগে নাম লেখালেন ভের্নার। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় বিভাগ থেকে বুন্দেসলিগায় উঠে এসেছে লাইপজীগ, সেই ইতিহাসও মাত্র ৭ বছরের। জার্মান ক্লাবগুলোর সর্বস্বীকৃত মালিকানার নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে উত্থান লাইপজীগের। তাই পূর্ব জার্মানির লাইপজীগ শহরের বাইরে নিন্দুকের অভাব নেই ক্লাবটি। এই ক্লাবে এসে তো ভুল করলেন না তরুণ প্রতিভা ভের্নার? উত্তরটা “না”বোধকই হবে। গতির সাথে স্কিলের মেলবন্ধন ঘটালেন কোচ রাল্‌ফ হাসেনহুটল। ব্যক্তিগত জীবনে মুখচোরা লাজুক স্বভাবের ভের্নার গোলের সামনে নির্মম-নির্দয়। লীগে ২১ গোল করে ক্লাবকে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লীগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিলেন। ২০ বছর বয়সেই সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বুন্দেসলিগায় ১০০ ম্যাচের অভিজ্ঞতা পুরলেন অর্জনের ঝুলিতে, যদিও পরে সেই রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছেন কাই হ্যাভার্টজ। পরের মৌসুমে (২০১৭-১৮) তে ১৩ বার খুঁজে নিলেন জাল, সতীর্থদের গোলে সরাসরি ভূমিকা রাখলেন ৭ বার। এই মৌসুমে সবচেয়ে কম বয়সে ১৫০ বুন্দেসলিগা ম্যাচ খেলার রেকর্ড করলেন, বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ক্লাবের প্রথম জয়ে করলেন জয়সূচক গোল। এরপর, পাঁচ ম্যাচে জোড়া গোল করা, ক্লাবের হয়ে ১০০ লিগ ম্যাচ, প্রথম ৫০ লিগ গোল, বুন্দেসলিগায় সবচেয়ে কম বয়সী ২০০ ম্যাচ খেলুড়ে, ডানিয়েল ফ্রানকে সরিয়ে ক্লাবের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠা (সবমিলিয়ে ১৫৯ ম্যাচে ৯৫ গোল) – “টার্বো টিমো” না হয়ে তাঁর ডাকনাম “রেকর্ড টিমো” হলেও এতটুকু বেমানান লাগতো না। জার্মানির হয়ে ততদিনে ২০১৭ সালের কনফেডারেশন্স কাপের শিরোপা জেতা হয়ে গেছে টিমোর। তিন গোল আর দুই অ্যাসিস্ট (যার একটি ফাইনালে) নিয়ে গোল্ডেন বুটও গেলো জার্মান গতিতারকার দখলে। লাইপজীগ ছেড়ে স্টুটগার্টের ছেলেটা লন্ডনে পাড়ি জমাচ্ছে। নতুন চ্যালেঞ্জ, কিন্তু আগের পরীক্ষাগুলোতে তো টিমো লেটার মার্ক পেয়েই পাস করেছেন? ইংলিশ লীগে কি তাঁর গতিতে কেউ লাগাম পড়াতে পারবে?

ভের্নারের গল্পটা সেই পরিশ্রম আর সাফল্যের আদি যুগলবন্দীর হলেও মুদ্রার উল্টোপিঠও দেখা হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। বিশ্বজয়ী জার্মানরা মুখ থুবড়ে পড়েছে ২০১৮ বিশ্বকাপের প্রথমপর্বেই, শালকার বিপক্ষে ডাইভ দিয়ে পেনাল্টি আদায়ের অপরাধে দুয়ো শুনতে হয়েছে প্রতিনিয়ত, এমনকি জার্মানির জাতীয় দলের হয়ে খেলার সময়েও নিজেদের সমর্থকেরা ছাড়েনি তাকে। বেসিকতাসের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে গিয়ে গ্যালারি থেকে আসা প্রচণ্ড শব্দে শ্বাসকষ্টে ভুগেছেন, উপায়ান্তর না দেখে তাকে মাঠ থেকে তুলে নিয়েছেন কোচ। কিন্তু বাধা-বিপত্তি আর সাময়িক ব্যর্থতা না থাকলে কি আর জীবনের পথে যাওয়াটা উপভোগ্য হয়ে ওঠে? কান্সটাটে বেড়ে ওঠা টিমো ভের্নার দেখিয়েছেন তিনি হারিয়ে যেতে না, বরং থাকতেই এসেছেন। প্রিমিয়ার লিগের ডিফেন্ডাররা তাই সাধু সাবধান! “টার্বো টিমো” আসছেন।