• ক্রিকেট

পেইস বোলারদের বিপ্লবের যুগ কি তবে ফিরছে বাংলার ক্রিকেটে??

পোস্টটি ৪৫৫ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

জ্বি হ্যাঁ, এইটা অনেকটা সন্দেহ সূচক প্রশ্নের মতো প্রশ্নই বটে। কেনোনা এই বাংলার মাটি যে কতোটা স্পিনের উর্ভর ভূমি সেটা আর নতুন করে বলার কিছুই নাই। এদেশের মাটিতে স্পিনের সুফল চাষাবাদে বহুবার এসেছে কিংবা ফলেছে সোনার ফসল। হাসি কিংবা গৌরবের উত্থান হয়েছে বেশ কবারই।

গোটা ক্রিকেট বিশ্ব এশিয়ার মাটি কে এক কথায় স্পিন চাষাবাদের উপযোগী ভূমি বলে আগেভাগেই নতমস্তকে প্রণামি জানিয়ে বলে দেয়, উস্তাদ আমি জানি আপনার স্পিন বিষের ছোঁবল কতোটা মারাত্বক রকমের বিষধর।

আর তাইতো একবার ইংলিশ ক্রিকেটার কেভিন পিটারসেন ক্রিকেট ভিত্তিক পোর্টাল ক্রিকভাজ কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন,

Bangladesh! It’s really hard to visit there. Especially when I was playing. I can’t play left-arm spin and every bowler in Bangladesh is like a left-arm spinner. After I got on the plane, the pilots also seemed to be spinning left-handed. People are walking on the runway, they are also spinning left-handed. To me, Bangladesh means left-arm spin”

এখন বোঝেন আমার কথাটা পিটারসেনের কথা পর কতোটা সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা মেলে কিনা।

সেই যাই হোক সময় এখন পরিবর্তন হয়েছে। এশিয়ার ক্রিকেটেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। এশিয়ায় ক্রিকেট মানেই যে স্পিনের ভেলকিবাজি কিংবা ভোজবাজির মতো ব্যাপার স্যাপার গুলোকে এখন তোয়াক্কা করে না ক্রিকেট বিশ্বের পেইস বোলিং স্বর্গের দিল গুলোও।

তার কারণ হিসেবে অনেক কারণ থাকলেও সবচেয়ে বড় কারণ আমি মনে করি এই জামানার টেস্ট কিংনা যেকোন সংস্করণে দলগুলোর নিজেদের শক্তিমত্তার জায়গা অনুসারে পিচের চরিত্র বানিয়ে ফেলা মেজর একটা ইস্যুই বলা চলে।

এর ফলে এশিয়ার পিচে এখনো এশিয়ার স্পিনারদের সেইরকমের দাপটের হাওয়া বইলেও এশিয়ার বাইরে গেলেই যেনো যতো ধরনের ক্যাচাল। একটা স্পিনারের ভালো মন্দের মানদণ্ডের পরীক্ষাটাই হয় আজকাল এশিয়ার বাইরের পিচে। এশিয়ার বাইরের পিচ স্পিনারদের অনুকূলে না থাকায় সেখানেই যতো বিপত্তি টা ঘটে।

তবে এখন আর সে যুগ নেই, এশিয়ার দল গুলোও এখন নিজেদের পেস বহর টা সাজায় নানান রকমের প্রতিভার টইটম্বুরে ভরপুর কিছু মেধাবী পেইসার দিয়ে। যার উদাহরণ টা টানা যেতে পারে এরূপে- গতি, সুইং আর নিখুত নিশানার লাইন লেন্থের মিশেলে গড়া কিছু পেইসারের সমন্বয়ে পেইস বহর তৈরির পিছনেই ছুটছে আজকাল এশিয়ার দলগুলো ও। যার নিপাট উদাহরণ বলা যেতে পারে বর্তমানের পাকিস্তান কিংবা ভারতের পেইস বোলিং অ্যাটাক কে।

তবে এখন প্রশ্নটা ধারায় এই জায়গায় যে এদেশেও কি আবারো ফিরছে পেইসারদের সুদিন? আমি শব্দটা আবারো বলছি এই কারণেই যে হিথ স্ট্রিকের জামানায় ও আলোর মুখ দেখেছিলো এই বাংলার পেইস বোলার রাজ্য। একাদশে তখন ৪ পেইসারের দেখে মিলতেও শুরু করে দিয়েছিলো। কিন্তু সে সময় টুকু আলোর দেখানোর টিজারেই কেঁটেছে। এরপর আবার যেই সেই। কোর্টনি ওয়ালসের জামানায় আবার যেনো বাংলাদেশের পেস বোলিং উইনিট দেখে নিয়েছিলো অন্ধকারের সর্বোচ্চ পর্যায়টাই।

একথা কেনো বলছি? প্রশ্নটা থেকেই যেতে পারে। তবে চলুন আমার এই কথার প্রেক্ষিতে কিছু দলিল দেখেই নেই-

২০১৬ সালের শেষ দিকে (অক্টোবর) থেকে শুরু করে টেস্ট খেলা প্রতিটা দলের মধ্যে বাংলাদেশের পেইস বোলিং উইনিট সব দিক থেকেই রয়েছে। সেটা আপনি বোলিং গড়ের কথাই বলুন আর বোলিং স্ট্রাইক রেইটের কথাই বলুন।

এই সময়ে বাংলাদেশের পেইস বোলারদের স্ট্রাইক রেইট ৮৯ এর থেকেও কিছুটা বেশি। অর্থাৎ এই সময় (অক্টোবর ২০১৬) বাংলাদেশের পেইস বোলাররা প্রতিটা উইকেট নেওয়ার জন্যে করেছেন প্রায় ৮৯ টির ও বেশি করে বল। আর অ্যাভারেইজের কথাই আর কি বলবো ভাই? সেখানেও প্রথমে আমরা। আই মিন তালিকার শেষ দিকে থেকে প্রথমে আমরা। এই সময়ে বাংলাদেশের পেইস বোলাররা প্রতিটা উইকেটের পিছনে ব্যয় করেছে প্রায় ৫৪ এর থেকেও কিছু বেশি রান।

ছোট করে বলে রাখি, এই সময়ে বাংলাদেশের পেইসাররা উইকেট নিয়েছে ৯০ টি, বিনিময়ে করতে হয়েছে ১৩৩৮ ওভার থেকেও ৩ বল বেশি করার কসরত ।

তবে এখনকার এদেশের ক্রিকেটে জাতীয় দলের নজরে থাকা পেইস বোলররা স্বপ্ন দেখাচ্ছে আবারো। আবারো আশা জোগাচ্ছে আমাদের পেইস বোলারদের বলেও নাকানিচুাবানী খাওয়ার দিন হয়তো নিকট ভবিষ্যতে দেখার সুযোগ আসলেও আসতে পারে।

অন্তত ঘরের মাঠে সম্প্রতি শেষ হওয়া দুই ঘরোয়া লীগ লীগ কিছুটা হলেও সেই স্বপ্নের ভিত টাকে করে দিচ্ছে শক্ত এবং আশার পালে যেনো দোলা দিচ্ছে এক নতুন দিনের বদলের যাওয়ার হাওয়ায়।

বিসিবি প্রেসিডেন্ট কাপে সেরা ১০ বোলার কিংনা উইকেটে টেকারের মধ্যে ৮ জনই ছিলেন পেইসার। (দুইজন স্পিনার- নাসুম আহমেদ এবং রিশাদ হোসাইন) বঙ্গবন্ধু টি২০ কাপে সেই সংখ্যাটা একেবারেই কম। সেরা দশে থাকতে পেরেছেন কেবল একজন স্পিনারই। সেটা বেক্সিমকো ঢাকার স্পিনার রবিউল ইসলাম রবি।

বিসিবি প্রেসিডেন্ট কাপে বোলার কর্তৃক উইকেট এসেছে ১০৪ টি। সেখানে ১৩ জন পেইসার বল করে উইকেট নিয়েছেন ৭৯ টি। যেখানে পেসার বল হাতে রান দিয়েছেন ১৫৩৯ রান। অর্থাৎ প্রতিটা উইকেট নিতে বোলাররা খরচ করেছেন গড়ে ১৯ এর থেকেও কিছু বেশি রান। ৭৯ উইকেট নিতে বিসিবি প্রেসিডেন্ট কাপে পেইস বোলাররা বল করেছেন ২০৯১ টি। সেই হিসেবে প্রতিটি উইকেগটের জন্যে (বোলিং স্ট্রাইক রেইট) পেইসাররা ব্যয় করেছেন গড়ে ২৬ টির মতো বল।

বঙ্গবন্ধু টি২০ কাপে বোলার কর্তৃক উইকেট এসেছে মোট ২৮৪ টি। এর মধ্যে আসরে ২৯ পেইসার (উইকেট পাওয়া এবং না পাওয়া সকলের হিসাবে) হাত ঘুরিয়ে উইকেট তুলে নিয়েছেন মোট ১৮৮ টি। পেইসারদের হাত থেকে বেড়িয়েছে মোট ৩৩৩০ টি লিগ্যাল ডেলিভারি। এই ডেলিভারিতে তারা রান খরচ করেছেন মোট ৪৪১০ রান।
অর্থাৎ উইকেট প্রতিটা পেইসাররা ব্যয় করেছেন ৩৭ এর উপরে রান এবং ১৭ বল অন্তর অন্তরেই তারা তুলে নিয়েছে উইকেট।

[এখানে একটা দিক খেয়াক রাখা ভালো হিসাব টা করা হয়েছে যারা উইকেট না পেয়েছে তাদের সহ আর তাই উইকেট প্রতি রানটা হিসেবের খাতায় বেড়েছে।]

ইতিমধ্যেই ঘোষনা হয়েছে গিয়েছে উইন্ডিজ সিরিজ উপলক্ষ্যে প্রাথমিক স্কোয়াড। হয়তো আজকালের মধ্যে ঘোষনা হতে যেতেও পারে সিরিজের মূল স্কোয়াড ও। সেখান টাই জায়গা হচ্ছে এতোদিন টাইগার ক্রিকেটের পেইস ইউনিটের প্রাণভোমরা মাশরাফি বিন মর্তুজার।

মাশরাফির না থাকাটা দলের জন্যে অবশ্যই বড় একটা অভাব। তার অভিজ্ঞতা আর নেতৃত্ব গুন নিয়ে কারো কোন প্রশ্ন থাকার কথাই নয়। কিন্তু বৃহৎ স্বার্থের জন্যে ক্ষুদ্র স্বার্থ ছেড়ে দিয়ে এখন সময় এসেছে ২০২৩ বিশ্বকাপের জন্যে আমাদের পেইস বোলিং ডিপার্টমেন্ট কে চাঙ্গা করে তোলার।

এখন সময় এসেছে এতোদিন জাতীয় দলে থাকার পরেও তরুন, উদীয়মান কিংবা প্রতিভাবান ট্যাগ৷ দেওয়া সেই খেলোয়াড়দের সামনে থেকে নেতৃত্ব নিয়ে দল এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আর নিজেদের ভিত্তি টা কে আরো মজবুত করার।

আর তাইতো বর্তমান বাংলাদেশের পেইস বোলিং ডিপার্টমেন্টের গুরু ওটিস গিবসন মনে করেন,-

"I am sure the experience that Mashrafe has, cannot be replaced, but I am sure these guys will see it as an opportunity to step up over the course of the three years leading up to the 2023 World Cup. (ইএসপিএন কে দেওয়া সাক্ষাতকারে)

ভালোর তো কোন শেষ নাই! এদেশের মাটিতে যেহেতু পেইস তেমন ফলেদী ফসল না, তাই পেইসারদের চেষ্টা করে যেতে হবে নিজের সর্বোচ্চ টা দিয়েই। লড়াই টা করে করে যেতে নিজের সাথে, নিজেদের মধ্যেই। প্রতিনিয়তই ভালো করার তাড়নায় লড়ে যেতে নিজের সব টুকু উজাড় করেই। তবে ফিরতে পারে এদেশে পেইসারদের সুদিন!

উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর টা আপনাদের কাছেই তুলে এটুকু বলবো দিনশেষে এমনটা হলে কিন্তু দেশের ক্রিকেটেরই মঙ্গল!