• ফুটবল

লিভারপুলের জেরার্ড, জেরার্ডের লিভারপুল

পোস্টটি ৫৭২ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
জন আর্নে রীসা ক্রসটা তুলেছিলেন ফার্নান্দো মরিয়েন্তেসের উদ্দেশ্যে, কিন্তু স্প্যানিশ স্ট্রাইকারের কাছে পৌঁছানোর আগেই ওয়েস্ট হ্যাম ডিফেন্ডার ড্যানি গ্যাবিডন হেড করে দলকে বিপদমুক্ত করলেন। কিন্তু আসলেই কি বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া গেলো? বক্স থেকে উড়ে বাইরে পড়া বলটা একবার ড্রপ খেলো, তারপর আরেকবার। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্টিভেন জেরার্ডের চোখ দুটো জ্বলে উঠলো যেন। দিনটা তাঁর জন্য বেশ পয়াই যাচ্ছে। ম্যাচের বয়স আধঘন্টা পেরোনোর আগেই হ্যামারদের চেয়ে দু’গোলে পিছিয়ে পড়েছিল অল রেডরা। নিখুঁত এক চল্লিশ গজি পাসে সিসেকে গোল বানিয়ে দিয়ে ব্যবধান কমিয়েছেন লিভারপুল অধিনায়ক। এরপর দারুণ এক ভলিতে করেছেন লক্ষ্যভেদ, ম্যাচে এসেছে সমতা। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে বল পেয়ে আর দ্বিতীয়বার ভাবেননি জেরার্ড। ক্লান্তিও যে তাঁকে ভাবার অবকাশ দেয়নি, পুরো ম্যাচে অমানুষিক পরিশ্রমের পর “ক্র্যাম্প” যেন তাঁর পা দুটোকে টেনে ধরছিল। বল নিয়ন্ত্রণে নেয়ার কথা মাথাতেই আসলো না তাঁর, দৌড়ে এসে শরীর নিংড়ানো অবশিষ্ট শক্তিটুকু দিয়ে ফার্স্ট টাইম হাফ ভলি মেরে বসলেন। কামানের গোলার গতিতে ৩৫ গজ দূরে ভেসে গেলো বলটা, ওয়েস্ট হ্যামের ক্যারিবিয়ান গোলরক্ষক শাকা হিজলপ ডানে ঝাঁপিয়েছিলেন। কিন্তু দিনটা তো জেরার্ডের, দিনটা লিভারপুলের। কার্ডিফের সেই বিকেলে ৩০,০০০ লিভারপুল সমর্থক আরো একবার অধিনায়ক শব্দটার মাহাত্ম্য বুঝলো। ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচটাকে ২-২ বানিয়েছেন লাল কাপ্তান, ৩-২ পিছিয়ে পড়ার আবার বাঁচিয়েছেন দলকে। পরে পেনাল্টিতে সেদিন সপ্তমবারের মতো এফএ কাপ জিতেছিল লিভারপুল ফুটবল ক্লাব, স্টিভেন জর্জ জেরার্ডের লিভারপুল ফুটবল ক্লাব। ঠিক এমনভাবেই লাল জার্সি গায়ে বহুবার মার্সিসাইডের দলটার ত্রাণকর্তা হয়েছেন তিনি, নিশ্চিত হারের মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছেন বিজয়। কপাইটদের কাছে জেরার্ড তাই কেবলমাত্র একজন ফুটবলারের বন্ধনীতে আটকে থাকেননি, খেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে বন্দরনগরীর প্রতীকই হয়ে উঠেছেন।
 
168c1aba7d47e9eea9369cdf69d66037
 
  • লিভারপুল পূর্বদিকের শহর হয়টনে বেড়ে ওঠা জেরার্ডের। আয়রনসাইড রোডে রাতদিন হরদম ফুটবলে তালিম চলতো। বল পায়ে ছোট্ট জেরার্ড কখন যেন ইয়ান রাশ হয়ে যেতেন, জন বার্নসের মতো গোল করার নেশা ছিল ওর। পার্কের কোণাটা হয়ে উঠতো ওয়েম্বলি, সেখানে পল গ্যাসকোয়েনের মতো কারিকুরিতে সবার তাক লাগিয়ে দিতো ছেলেটা। ইংল্যান্ডের স্কুলবয় দলে সুযোগ না পেয়ে কেঁদে বুক ভাসালো, একাডেমির মাইকেল ওয়েনকে খানিকটা ঈর্ষাও করতে শুরু করেছিল। মূলদলের হয়ে অভিষেক ১৮ বছর বয়সে, ব্ল্যাকবার্নের বিপক্ষে লীগের সেই ম্যাচে রাইটব্যাক হিসেবে শেষ কয়েক মিনিট খেলেছিলেন। তবে শুরুতেই দলে থিতু হতে পারছিলেন না, দলের কোচ জেরার্দ হুলিয়ে কখনো তাঁকে খেলাচ্ছিলেন মিডফিল্ডে, কখনোবা রাইটব্যাকে। এক মৌসুম বাদে (১৯৯৯-২০০০) জেমি রেডন্যাপের সাথে মিডফিল্ডে ভালো রসায়ন জমে উঠতে না উঠতেই ফের ধাক্কা। মার্সিসাইড ডার্বিতে রবি ফাউলারের বদলি হিসেবে নেমেছিলেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বাজে ট্যাকেলে দেখতো হলো লাল কার্ড। শুরুর দিনগুলোতে গোল করার চেয়ে গোল ঠেকানোর দিকেই বেশি ধ্যান দিতেন, ক্যানভাসে শিল্পীর চেয়ে ময়দানের যোদ্ধা হিসেবেই লোকে চিনতো তাঁকে। তবে বয়সভিত্তিক ফুটবলের চেনা গণ্ডি ছেড়ে পেশাদার মঞ্চে এসেই যেন চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। কীভাবে ট্রফি জেতা যায় সেই চিন্তায় ঘুম আসতো না, স্নায়ুচাপের প্রভাবটা মাঠেও পড়ছিল। সাথে চোট তো ছিলোই। তবে দুর্দিনের মেঘ কাটতে বেশি সময় লাগলো না, ২০০০-০১ মৌসুমেই নিজেকে ঢেলে সাজিয়ে ফেললেন, দেখা মিললো ট্রফির। লীগ কাপ, এফএ কাপ জিতে নিলো “অল রেড”রা; ইউয়েফা কাপ ফাইনালে তো গোলই করে বসলেন। ডর্ট্মুন্ডের ওয়েস্টফালেন্সটাডিওনে ১৬ বছর পরে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার ফাইনাল খেলতে নেমেছিল হুলিয়ের দল, হেইসেল দুর্ঘটনার পর সেমিফাইনালের চৌহদ্দি পেরোনো সেই প্রথম। টেনিস র্যালির মতো সেই ম্যাচে ৫-৪ গোলে জিতেছিল লিভারপুল, গোল করে জেরার্ড বুঝিয়ে দিলেন মঞ্চ যত বড়ই হোক না কেনো, প্রতিপক্ষ তাঁর বুকে কাঁপন ধরাতে পারবে না।

thumb_30605_default_news_size_5

 
  • মহাদেশীয় প্রতিযোগিতায় আর মাত্র একবারই ফাইনালে জয়ী দলের হয়ে খেলেছেন জেরার্ড, ২০০৫ সালের মে’র পঁচিশ তারিখটা কোনো লিভারপুল সমর্থক হাজার চেষ্টা করলেও ভুলতে পারবেন না। দু’বছর আগেই ইউরোপ সেরার মুকুট পড়া ডন কার্লো আনচেলত্তির এসি মিলানের পক্ষেই বাজি পড়েছিল বেশি, চোখ ধাঁধানো ফুটবলে সেটার প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছিল মাঠে। ৪৪তম মিনিটে কাকার জাদুকরী এক পাসে ক্রেসপো চমৎকার এক ফ্লিকে মিলানকে তিন গোলে এগিয়ে দিলেন, তুরস্কের আতাতুর্ক অলিম্পিক স্টেডিয়াম গ্যালারির লাল অংশ তখন যেন পাথরে গড়া মূর্তি। তবে তাঁদের একজন নেতা আছেন, আর এমন পরিস্থিতিতেই তিনি জ্বলে ওঠেন সবচেয়ে বেশি। ৫৪তম মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে উড়ে আসা ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে লিভারপুল শিবিরে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনলেন, ভ্লাদিমির স্মিসারের গোলে সেটা দৃঢ়তা পেলো। ম্যাচের বয়স ঘন্টার কাঁটা ছোঁয়ার কিছুক্ষণ আগে পেনাল্টি জিতলো লিভারপুল, আদায় করলেন কে? সেই জেরার্ডই। শাবি আলোন্সোর শট দিদায় ঠেকে গেলেও স্প্যানিশ মিডফিল্ডার ঠিকই সমতায় ফেরালেন দলকে। এরপর দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়া, ভাগ্যের পরশ আর সবশেষে জের্জি দুদকের অতিমানব হয়ে ওঠা। আরো একবার পেনাল্টির লটারিতে জয়ী দলটার নাম লিভারপুল; হিউজ, থমসন, সুনেসদের পর চতুর্থ লিভারপুল অধিনায়ক হিসেবে বড় কানওয়ালা ট্রফিটাকে মাথার উপর তুলে ধরলেন স্কাউজারদের ঘরের ছেলে। কিন্তু ফুটবল ক্যারিয়ারে ব্যর্থতার আগুনে পুড়েছেন বহুবার, সবচেয়ে তেতো স্বাদটা দিয়েছে ২০১৪ সালে চেলসির বিপক্ষে লীগ ম্যাচটা। জোসে মরিনহোর প্রথম দফায় তল্পিতল্পা গুটিয়ে লন্ডনে চলে যাবার ব্যাপারে মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ক্লাবের প্রতি ভালোবাসার টানে বাঁধন ছিড়তে পারেননি। সেই চেলসির বিপক্ষেই ১০ বছর পরের এক বিকেলে হোঁচট খেয়ে পড়লেন লিভারপুল অধিনায়ক। মমাদু সাকোর পাসটা বেশ নিরীহদর্শনই ছিল, কিন্তু জেরার্ডের ভুলের সুযোগ নিয়ে দেম্বা বা এগিয়ে দিলেন চেলসিকে। হাতের মুঠোয় পুরে ফেলা প্রিমিয়ার লীগ ট্রফিটা অবিশ্বাস্যভাবে হাতছাড়া হয়ে গেলো – স্টারিজ, সুয়ারেজের গোল বন্যা, কুতিনহোর জাদু কিংবা ১৩ গোল ও সমানসংখ্যক অ্যাসিস্ট করা জেরার্ডের পরিশ্রম বিফলে গেলো। লাল জার্সি গায়ে ইতি টানাটাও মনমতো হলো না। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে নিজের শেষ ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে থাকতে পারলেন মাত্র ৩৪ সেকেন্ড। অ্যানফিল্ডে নিজের ম্যাচে দল ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে হেরে গেলো ৩-১ গোলে। তবে শেষ ম্যাচটা যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেলো, স্টোক সিটির কাছে ৬-১ গোলে হারলো রজার্সের দল, পেনাল্টি থেকে জেরার্ডের গোলটাকে সান্ত্বনা বললেও বাড়িয়ে বলা হবে। এই তো সেদিনই তো লাল জার্সিটা গায়ে চাপিয়েছিলেন, এর মধ্যেই পথ ফুরিয়ে এলো।

28C04A1F00000578-0-image-a-3_1431795646915

 
ইংল্যান্ডের হয়ে তাঁর চেয়ে (১১৪) ম্যাচ খেলেছেন মাত্র তিনজন, দেশকে বিশ্বকাপ আসরে নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতাও আছে। তবে সিংহত্রয়ীদের “সোনালী প্রজন্ম”এর সদস্য হয়েও কখনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার শেষ চারে ওঠা হয়নি। ৪-৪-২ ছকে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের সাথে মিডফিল্ড জুটিটা জমাতে পারেননি, পল স্কোলস তো হতাশায় অবসরই নিয়ে ফেললেন। ২০০৬ বিশ্বকাপে পেনাল্টিতে আটকে গেলেন, ২০১০ বিশ্বকাপে জার্মান দেয়ালে ধাক্কা, পরের বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায়। তবে ক্লাব ফুটবলের জেরার্ড মানে প্রতিভা আর পরিশ্রমের মিশেলে গড়া মনোমুগ্ধকর এক ফুটবলার। কী করতে পারতেন না তিনি? বল কাড়তে পারতেন, মাঠের এক প্রান্ত থেকে নির্ভুল সব আড়াআড়ি পাস ছাড়তে জুড়ি ছিল না তাঁর, আর অভাবনীয় সব গোলের প্রতি দুর্বলতাটা ছিল লক্ষণীয়। দলকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, বিপদের দিনে তাঁর শরণেই মুক্তি মিলেছে। তবে চিরায়ত গ্রীক ট্র্যাজেডির নায়কের মতো স্বর্গ থেকে পতনও হয়েছে। তবে এর নামই তো জীবন। জেরার্ডও সব মেনে নিয়েছেন। নিজের আত্মজীবনী মাই স্টোরির শেষে লিখেছেনঃ “আঁধার-আলো, হর্ষ-বিষাদ, আশা-নিরাশাকে আদতে আলাদা করা যায় না। অ্যানফিল্ডের কপ প্রান্তের ফাঁকা গোলের দুই পোস্টের মতোই তারা অবিচ্ছেদ্য।” কার্ডিফের “জেরার্ড ফাইনাল” এর জনক বোধহয় দার্শনিক হলেও পারতেন!