• বুন্দেসলিগা
  • " />

     

    'ফুটবলের নতুন দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগতম'

    অ্যানফিল্ডে ডিয়েগো সিমিওনের উল্লাসের ছবিটা আপনার কাছে ঝাপসা প্রায়। ফুটবলের সঙ্গে আপনার সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে দুই মাস হলো। সাধারণত মৌসুম শেষে এর কাছাকাছি সময় আপনি ফুটবল ছাড়াই থাকেন। তবুও এই অপেক্ষাটা আপনার জন্য অনেক লম্বা। সিমিওনের ছবিটা আপনার কাছে অস্পষ্ট, মৌসুম শেষে আপনার এই অনুভূতি হয় না। ফুটবল আপনাকে ঘটা করে বিদায় দেয়নি। তাই অপেক্ষার চেয়ে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সূত্র মেনেছেন আপনি।

    ওই একইদিন প্যারিসের মাঠে ম্যাচ হয়েছে আরও একটি। পিএসজি চতুর্থবারের চেষ্টায় চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল সে রাতে। সে রাতের কথা আপনার আরও মনে নেই। পার্ক ডি প্রিন্সেসে ছিল না কোনো দর্শক, ছিল না হৈ-হুল্লোড়। আপনি ফাঁকা মাঠের খেলায় তৃপ্তি পাননি।

    এখন অবশ্য যে কোনো ধরনের ফুটবল খেলা পেলেই হয়ত আপনি বসে যাবেন টিভির সামনে। সেটা ফাঁকা মাঠে হোক, ঝিম ধরা ধারাভাষ্যে হোক। আপনাকে জীবন ওই পর্যন্ত নিয়ে ঠেকিয়েছে। এখন আপনার ফুটবল হলেই হলো। এই বিরতিটা সম্ভবত ফুটবলের নতুন রূপ আলিঙ্গন করতে প্রয়োজনও ছিল।

    শনিবার বিকেলে সিগন্যাল ইদুনা পার্ক রঙ-বেরংয়ের ব্যানারে ছেয়ে যাওয়ার কথা ছিল। রুর ডার্বিতে মানে দুই শহরের ক্লাবের কাছে বিশেষ কিছু। ডের ক্লাসিকের (বায়ার্ন মিউনিখ-ডর্টমুন্ড ডার্বি) অনেকটাই ‘মিডিয়ার সৃষ্টি’, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড আর শালকের ডার্বিতে সেই গন্ধ নেই। আছে ঝাঁঝ, আর ডার্বির আদ্দিকালের আবেগ।


    এবারের রেভিয়ের ডার্বিতে আপনি এর অনেক কিছুই পাবেন না। এমনিতে ৮২ হাজার সমর্থকে ঠাসা থাকার কথা ছিল সিগন্যাল ইদুনা পার্ক। থাকেবন না একজনও। আসলে থাকতে পারবেন না। ক্লাব প্রেসিডেন্টদের রীতিমত হাতজোর করে সমর্থকদের স্টেডিয়ামের বাইরে ভিড় না করার অনুরোধ করতে হয়েছে।  গ্যালারি বন্ধ থাকলেও এই 'পাগলা' সমর্থকেরা স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। এবার এমন কিছু ঘটলে অবশ্য ক্লাবগুলোকেই পেতে হবে সাজা।

    গ্যালারির ফাঁকা সিটে দুই-একজন ক্যামেরাম্যান চোখে পড়তে পারে আপনার। বাকিটা শুনশান নীরবতা। বুটে বল লাগলে আওয়াজ কতোখানি হয়, খেলোয়াড়রা ম্যাচ চলার সময় একে অন্যের সঙ্গে কতোখানি যোগাযোগ করেন, কোচ কাকে ডাকেন, কার ওপর রাগ ঝাড়েন আর দুই একটি 'এফ'- বর্গীয় ইংরেজি শব্দ- খেয়াল করে খেলা দেখলে সবকিছু জানা হয়ে যাবে আপনি। ট্যাকটিক্যাল বা টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলোর জন্য কয়জন ফুটবল দেখেন? আপনার ফুটবলের সঙ্গে প্রেমের গল্প নিশ্চয়ই ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণ দিয়ে হয়নি? তেমনটা হয়ে থাকলে আপনি ফুটবল ভালোবেসেছেন অনেক পরিণত বয়সে। এই ফুটবল দেখিয়ে কাউকে ফুটবলের প্রেমে ফেলতে পারবেন না আপনি।


    আরও পড়ুনঃ বুন্দেসলিগা কবে, কখন ও কীভাবে দেখবেন?


    বাংলাদেশে অবশ্য ফাঁকা মাঠে ফুটবল নিয়মিত ঘটনা। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম বা নীলফামারির শেখ কামাল স্টেডিয়ামের ম্যাচগুলোর সব যে ‘অরুচিকর’ তা কিন্তু নয়। আপনার ইউরোপিয়ান ফুটবলের জিভ দিয়ে ‘দেশী ফুটবলের’ স্বাদ যাচাই করতে চাওয়া নিতান্তই বিচারকার্যের ভুল। ওই 'অ'রুচিকর ফুটবলের সঙ্গে ভরা গ্যালারি, উন্নত সম্প্রচার মান আর মানসম্পন্ন ধারাভাষ্য গুলিয়ে দিলে আপনার নিখাদ বিনোদনের আরেকটি শাখার বিস্তার ঘটবে- সেটা মোটামুটি নিশ্চিত করে বলা যায়।

    নতুন চেহারার ফুটবলে আপনি সব পাবেন, ওই উত্তেজনাটাই পাবেন না। অ্যাওয়ে গোল নামে একটা টার্মই ফুটবলে জন্ম হয়েছে সমর্থকদের জন্য। প্রতিপক্ষের মাঠে আপনি যাবেন, তাদের দুয়ো খেয়ে এক গোল দিতে পারলে সেই গোলের দাম তাই একটু বেশি। মোটা দাগে অ্যাওয়ে গোলের সংজ্ঞাটা এমন কিছুই। এবার আর অ্যাওয়ে গোল দিয়ে ওই সমর্থকদের, ‘দেখ ব্যাটা, তোদের মাঠে এসে হারিয়ে গেলাম’ গৌরবটা কাজ করার কথা নয় খেলোয়াড়দের। উদযাপনটাও কী খাটো হবে তাহলে?

    ৬১ দিন পর মাঠে নেমে ইউনিয়ন বার্লিন খেলবে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে। একসময় পূর্ব জার্মানির ক্লাব ইউনিয়ন বার্লিনের ইতিহাস বায়ার্নের ধারে কাছেও না। পূর্ব আর পশ্চিম জার্মানির ফুটবলের রেষারেষিটা রয়ে গেছে সমর্থকদের মাঝে। দুই জার্মানি এক হওয়ার পর এবারই প্রথম বুন্দেসলিগায় উঠেছে ইউনিয়ন বার্লিন। বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ঘরের মাঠের ম্যাচের দিনটা সব সমর্থকের ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালির আঁচড় কেটে গেছে। এতোদিনের অপেক্ষার পর এমন ম্যাচও তাদের দেখতে হবে ঘরে বসে।


    আগস্টে এই মাঠেই বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল ইউনিয়ন বার্লিন। নিজেদের মাঠ পুঁজি করে বরুশিয়া মনশেনগ্লাডবাখ, হার্থা বার্লিন- বুন্দেসলিগার নামী দামী সব ক্লাবকে হারানো হয়ে গেছে তাদের। প্রত্যেকটি জয়ে ঘরের সমর্থকদের সমর্থনের আছে বিরাট ভূমিকা। এবার বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে সেই সমর্থন পাবে কই ইউনিয়ন বার্লিন? জৌলুসের হিসাবে আগে তো আগেই বাদ, এখন যাও ছিল পুঁজি ‘গরীবের’ ক্লাবের সেই সম্বলটুকুও নেই।  

    ইউনিয়ন বার্লিন অবশ্য বায়ার্নের বিপক্ষে গোল একটা করে বসলেও খুব বেশি লাভ নেই। সেখানেও নির্দেশিকা ঝুলবে। মাঠের ভেতর একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরাটাই নিরুৎসাহিত করেছে বুন্দেসলিগা। ফাঁকা মাঠের সঙ্গে আসলে খেলোয়াড়দের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোও বিসর্জন দিতে হচ্ছে ফুটবলকে। খেলোয়াড়রা টেনেল দিয়েই ঢুকবেন আলাদা সময়ে। অসামাজিকতা আর দাম্ভিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন দেখিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলাবেন না খেলা শুরু আগে। একটা টিম ফোটো তুলে যে বাঁধিয়ে রাখবেন। সেই সুযোগও নেই। পাছে টিম ফোটো তুলতে গিয়ে সতীর্থের কাঁধে হাত দিয়ে বসে কেউ? লিগ কমিটি তাই ওই নিয়মও করেছে বাতিল।

    নিয়ম না মানলে কী হবে? অসবার্গ কোচ হিরলিখকে জিজ্ঞেস করতে পারেন এই প্রুশ্নের উত্তর। হোটেল ছেড়ে টুথপেস্ট কিনতে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। এখন থাকতে পারবেন না ডাগ আউটে, নিষিদ্ধ হয়েছেন অনুশীলন থেকেও।


    ফুটবল ফেরায় খেলোয়াড়দের পর সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা ক্রীড়া সাংবাদিকদের। খেলা তো তাদেরও রুটি-রুজি! অবশ্য চাইলেই আর প্রেসবক্সে ঢুকে যাওয়া যাবে না এখন। মনে কোনো প্রশ্ন এলে ম্যাচশেষে কাউকে জিজ্ঞেস করবেন, সেটি দিয়ে একটি নিউজ করবেন- সেই খায়েশও মিটছে না এখনই। সংবাদ সম্মেলন, মিক্সডজোন- সবই থাকবে বন্ধ।

    করোনাভাইরাস সংক্রমনের পর সবার পরে এসেছিল বুন্দেসলিগা বন্ধের ঘোষণা। ইতালি, স্পেনের তুলনায় জার্মানির অবস্থাকে ‘ভালোই’ বলতে হবে। সংক্রমণের হার কম, মৃত্যুহারও কম। আবার সবচেয়ে বেশি টেস্টিং কিটও জার্মানির। সবার আগে ফুটবলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার যুক্তি ছিল, তবে সাহসটাও দেখাতে হয়েছে জার্মানিকে

    লিগ শুরুর দিন-তারিখ নির্ধারণের পর থেকে জার্মানির প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের ক্লাবগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থপরীক্ষা হয়েছে। করোনা পজিটিভ যে মেলেনি তাও না। তবে তাদেরকে ছাড়াই লিগ শুরু করার পথে হেঁটেছে বুন্দেসলিগা। লিগের টাস্কফোর্স কমিটির চেয়ারম্যান হেক্টর মায়ার বলছেন, কেউ আক্রান্ত হলে সেটা মিডিয়ার সামনে গিয়ে বলতে হবে না। তাকে ছাড়াই ক্লাব তার নির্দেশিকা মেনে চালিয়ে যাবে অনুশীলন আর খেলা। ‘যথেষ্ট’ টেস্টিং কিট মজুদ থাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষাতেও বাধা নেই। এই সাহস দেখানোর সুযোগও ছিল জার্মানির।

    বুন্দেসলিগা আসলে সেই সাহসের দাম দিতে গিয়েই নতুন দিনের সূচনা ঘটাল। অবশ্য বুন্দেসলিগার এই যাত্রাটা অজানা, অচেনা এক পথে। জুনের ৩০ তারিখের আগে লিগ শেষ করলে টেলিভিশন সম্প্রচারের পুরো ৩০০ মিলিয়ন ইউরো পাওয়া যাবে। আড়ালে আছে সেই এজেন্ডাও। বুন্দেসলিগার  পরিকল্পনা সফল হলে সেটা সাহস যোগাবে ইউরোপের বাকি দেশগুলোকে। আবার এই পথে হোঁচট খেলে এই ফাঁকা মাঠের ফুটবলও আরও কতোদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায় কে জানে! তাই ফুটবলের এই ফেরার ছবিটা আপনার কাছে প্রাণবন্তই মনে হবে বহুদিন। টানেল দিয়ে মার্কো রয়েস আর অ্যালেক্সান্ডার নুবেল আলাদা সময়ে মাঠে ঢোকার ছবিটাই আপনার কাছে ‘নতুন ফুটবল’। এই দুনিয়ায় আগামী অনেকদিনের জন্য আপনাকে স্বাগতম।