• ক্রিকেট

লেগস্পিনের কি হবে তাহলে?

পোস্টটি ১৬০৩ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

বিশ বছরের বেশি হল আমরা টেস্ট ক্রিকেট খেলছি। আমাদের দর্শকদের মধ্যে অনেকেই এমন আছে যারা এই বিশ বছরের পুরোটারই সাক্ষী। একটা কথা প্রচলিত আছে যে গত বিশ বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট সবদিক থেকে এগিয়ে গেলেও দুটো ক্ষেত্রে পিছিয়েছে। একটা হল ক্রিকেটীয় কূটনীতি এবং আরেকটি হল টেল-এন্ডের ব্যাটিং। এই ক্ষেত্রে হয়তো কিছু বিতর্কের জায়গা আছে। কিন্তু একটা জায়গাতে বাংলাদেশ বিশ বছর আগেও ভালো ছিল না এবং বিশ বছর পরেও কোনো ভালো অবস্থানে নেই। তা হল লেগস্পিন। এ নিয়ে যে কেউ কোনো দ্বিমত করবে না তা নিয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত।

বাংলাদেশের এই লেগস্পিন ইতিহাস খুবই ক্ষুদ্র। হ্যা ঠিক যে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট হ্যাটট্রিক অলক কাপালির লেগস্পিন থেকেই এসেছিল। কিন্তু অলক কাপালিকে কেউ লেগস্পিনের জন্য খুব একটা মনে রাখেন না এখন। শেষ যে বা সম্ভবত একজন লেগস্পিনারের নামই বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের মনে রাখার মত আছে আর তিনি হলেন জুবায়ের হোসেন লিখন। কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের এক্সপেরিমেন্টের ফল ছিলেন তিনি। এবং অল্প বিস্তর সাফল্যের দেখাও পান। তার শেষ আন্তর্জাতিক উইকেটও ছিল ভিরাট কোহলি। কিন্তু তার পর থেকে তাকে আর কোথাও ওরকম খুঁজে পাওয়া গেল না। এমনকি কোনো লেগস্পিনারই ওরকম আর পাওয়া গেল না। শেষ কয়েক সিরিজে আমিনুল ইসলাম বিপ্লবকে দিয়ে এই শূণ্যতা পূরণের চেষ্টা করানো হয়েছে। কিন্তু তিনিও তো হার্ডকোর লেগস্পিনার নন। দলের প্রয়োজনে নিজেকে লেগস্পিনার বানাচ্ছেন। এই জুবায়েরের হারিয়ে যাওয়াতে তার নিজের দোষ রয়েছে। সত্য। কিন্তু তিনি বা অন্য কোনো লেগস্পিনারদের যে আর জাতীয় দলে দেখা গেল না তাতে তো দোষটা আসলে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট সংস্কৃতির। অন্তত আমি সেভাবেই দেখি বিষয়টি। এটা নিয়েই মূলত আজকের এই লেখা।

যখন কোনো বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আমাদের এই লেগস্পিন দৈন্যতা নিয়ে আলোচনা হয় তখন যে পয়েন্টটা সবার আগে তুলে ধরা হয় তা হল আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে লেগস্পিনারদের পর্যাপ্ত সুযোগ না দেওয়া। ঘরোয়া ক্রিকেট আগে ওইরকম প্রচারণা পেত না। তাই ব্যাপারটা সাধারণের আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু এই বঙ্গবন্ধু টি টোয়েন্টি কাপ এই ব্যাপারটা চোখে আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করে দেয়।

বঙ্গবন্ধু টি টোয়েন্টি কাপে ফরচুন বরিশালে আমিনুল ইসলাম বিপ্লব এবং জেমকন খুলনাতে রিশাদ হোসেন সুযোগ পান। তাদের পারফরম্যান্সের বিচার আমি করব না। কারণ যে পরিমাণ তথ্য হাতে থাকলে একজনের পারফরম্যান্স বিচার করা সম্ভব সে পরিমাণ সুযোগই তো তারা পান নি। তাহলে কিভাবে তাদের ফয়সালা করা সম্ভব? প্রথমে রিশাদ হোসেনের কথাতেই আসি। প্রথম ম্যাচে তিনি সুযোগ পাননি। পরের ম্যাচে সুযোগ পান। তিন ওভারে ৩৪ রান দিয়ে খরুচে একটু ছিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেট তুলে নেন। হয়তো এই দুই উইকেটের জন্যই পরের ম্যাচেও সুযোগ পান। সেখানে এক ওভার চার বল বোলিং করে দশ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকেন। ওই ম্যাচটায় মাত্র ৮৭ রানের পুঁজি হাতে থাকায় বোলারদের কিছু করারও সুযোগ ছিল না। ব্যস। এই পর্যন্তই। এরপর আর রিশাদ হোসেনকে এই টুর্নামেন্টে দেখা যায়নি। আরেক লেগস্পিনার বিপ্লবের অবস্থা আরো করুণ। তিনি যদিও বরিশালের প্রথম ম্যাচেই সুযোগ পান। সে ম্যাচে তিন ওভারে বিশ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকেন। বর্তমানের টি-টোয়েন্টি যুগে একে মোটামুটি ভাল বোলিং বলা যায়। কিন্তু আর কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগই তিনি পেলেন না।

মজার ব্যাপার হল যেই দুই দলে এই দুইজন ছিলেন সেখানে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং তামিম ইকবাল অর্থাৎ আমাদের পপঞ্চপাণ্ডবদের চারজনই ছিলেন। এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এই পঞ্চপাণ্ডব জাতীয় দলে একটি কোয়ালিটি লেগস্পিনারের অভাব নিয়ে তাদের হাহাকারটাও তারা কখনো অপ্রকাশিত রাখেন না। কিন্তু তবুও কোনো না কোনোভাবে এই চারজন দলে থাকা অবস্থাতেই তাদের দলে লেগস্পিনারদের সুযোগ পাওয়ার অপ্রতুলতা দেখা যায়। যদি তাদের থাকা অবস্থাতেই এইরকম অবস্থা দেখা যায় তবে আমাদের বাকি টুর্নামেন্টের বাকি দলগুলোর ক্ষেত্রে কি অবস্থা হয় সে না হয় বাদই দিলাম।

এবং আরো দৃষ্টিকটুভাবে ব্যাপারটা চোখে পড়ে যখন দেখতে পারি যে বিপিএলে নিয়ম করে দেওয়ার পর দলগুলো লেগস্পিনার দলে নেয়। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে লেগস্পিনারদের পারফরম্যান্স বা সফলতা দেখলে প্রত্যেক দলের নিজেরই উচিত অন্তত একটা করে লেগস্পিনার রাখা। তাদের প্রাথমিক গেমপ্ল্যানেই একটা লেগস্পিনার থাকা উচিত। তারপরেও এই ব্যাপারটা আমাদের ক্রিকেটবোধের উপর একটি চপেটাঘাত ছাড়া আমি কিছু মনে করি না।

জেমকন খুলনা চ্যাম্পিয়ন হয়। তাই তাদের দল নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করা যায় না। ফরচুন বরিশাল সে জায়গাটা থেকে অনেক দূরে ছিল। তাই তাদের হয়তো করা যায়। কিন্তু কোনো দল নির্বাচন নয় বরং আমার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের ক্রিকেটীয় চিন্তাভাবনা এবং ক্রিকেটীয় সংস্কৃতিটাকে সমালোচনা করা। যে চিন্তাধারা আর সংস্কৃতির কবলে পড়েই জুবায়ের হোসেন লিখনের শেষ আন্তর্জাতিক উইকেট ভিরাট কোহলি হবার পরেও সে ডিপিএলে জায়গা পান না। এইটা আসলেও অনেক দুঃখজনক যে আমাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ চারজন ক্রিকেটারও বর্তমান সময়ের চাহিদা বুঝতে না পেরে লেগস্পিনার তাদের দলে ব্যবহার করলেন না। জানি না এই সমস্যটা আসলে তাহলে কত গভীর। আর এও জানি না যে এভাবে চলতে থাকলে আদৌ কোনোদিন আমাদের লেগস্পিনারের হাহাকার পূরণ হবে কিনা।