• অলিম্পিক

পোডিয়ামের বিস্মৃত 'তৃতীয়' ব্যক্তিঃ মানবতাবাদী পিটার নর্ম্যানের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয় অস্ট্রেলিয়া

পোস্টটি ৮৬৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।
 
১৯৬৮, মেক্সিকো অলিম্পিক, পুরুষদের ২০০ মিটারের ফাইনাল। সেবার বিশেষজ্ঞদের ধারণা আমেরিকা যা দল নিয়ে ফাইনালে এসেছে তিনটে মেডেলই তাদের নিশ্চিত। হিট থেকে শুরু করে রেসের ফাইনাল অব্দি আগে পর্যন্ত মোট ৫ বার অলিম্পিক রেকর্ড ভাঙ্গে যার মধ্যে ৪ বারই ছিল আমেরিকার দুইজন টমি স্মিথ এবং জন কার্লোসের হাতে।
 
ফাইনালে টমি স্মিথ ১৯.৮৩ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে অলিম্পিক রেকর্ড তৈরী করেন আর জন কার্লোস হন তৃতীয়। দ্বিতীয় স্থান পান অস্ট্রেলিয়ার পিটার নর্ম্যান (২০.৬ সেকেন্ডে যা ছিল জাতীয় রেকর্ড এবং তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পারফরম্যান্স)।
 
img_8285
 
এবার যা হয়। প্রথম হয়েছেন টমি স্মিথ, গলায় মেডেল পরে দর্শকদের অভিবাদন কুড়বেন টমি, আমেরিকার পতাকাটা ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাবে আর বেজে উঠবে ‘স্টার স্প্যানগ্যল্ড ব্যানার’। এটাই দস্তুর। যেকোনো দেশের ক্রীড়াবিদরা এর স্বপ্নেই সারাজীবন কাটিয়ে দেন।
এবার আপনি নিচের ছবির দিকে দেখুন। গলায় মেডেল পরা অবস্থায় টমি স্মিথ এবং জন কার্লোস তাঁর দেশের পতাকার দিকে ফিরেছেন, দুজনের কারোর পায়ে জুতো নেই। টমির ডান এবং কার্লোস এর বাম হাতে কালো গ্লাভস , মুষ্ঠিবদ্ধ। হাত সোজা উপরে উঠে গেছে, মাথা হাল্কা নোয়ানো। আমেরিকার আফ্রিকান আমেরিকান কমিউনিটির বিরুদ্ধে ঘটে চলা অত্যাচারের প্রতিবাদে আমেরিকার দুই কৃষাঙ্গ দৌড়বিদের পরিকল্পিত ‘ব্ল্যাক পাওয়ার স্যালুট’ এ রে রে করে ঊঠল আমেরিকার অলিম্পিক কমিটি আর আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। নিজেদের ঘরের ঝামেলা নিজেরা সামলাও, অলিম্পিকে এসব আনা কেন বাপু- এই বলে দুজনকেই অলিম্পিক ভিলেজ থেকে বের করে দেয় আভেরি ব্রান্ডেজের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি।
 
101825325_2671507769800209_7023977992481144832_o
 
এখন ব্রান্ডেজ এর পক্ষে এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন কঠোর তেমনি স্ববিরোধী। বিতর্ক সত্ত্বেও আভেরি ব্রান্ডেজের খেলার মধ্যে রাজনীতিকে না আনার বা আভ্যন্তরীণ বিষয়ে না জড়ানোর বিবৃতি চমকপ্রদ কারণ এই ব্রান্ডেজের নেতৃত্বেই আমেরিকার শত বিরোধিতার পরেও সোভিয়েত ইউনিয়নকে অলিম্পিক কমিটির মধ্যে আনা হয় বা দুই জার্মানির যৌথ দল অলিম্পিকে যোগদান করে। ( যার পর ব্রান্ডেজ বলেছিলেন রাজনীতি যা করতে পারে না অলিম্পিকের মূল্যবোধ তা করতে পারে)। এমনকি ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকে গেমস ভিলেজে ইজরায়েলীদের হত্যার পর সব দিক থেকে যখন অলিম্পিক বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠেছিল তখন তিনি দৃঢ় স্বরে জানান “the Games must go on”। তিনি বিশ্বাস করতেন অলিম্পিক সমাজ বদলাতে পারে।
 
মেক্সিকো অলিম্পিক প্রথম থেকেই সে বছর একের পর এক বিতর্কের সামনে পড়ে । অলিম্পিক শুরু হওয়ার আগে মেক্সিকো সরকারের অর্থনৈতিক নীতির প্রতিবাদে ছাত্ররা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন অলিম্পিক শুরুর ১০ দিন আগে সেনা এবং ট্যাঙ্ক পাঠিয়ে সেই আন্দোলন স্তিমিত করে মেক্সিকো সরকার যার ফলে ১০০ এর উপর আন্দোলন কারী মারা যান। এছাড়া আফ্রিকার একাধিক দেশ অলিম্পিক শুরুর আগে জানায় বর্ণবৈষ্যম্যে জর্জরিত দক্ষিণ আফ্রিকা অলিম্পিকে অংশ নিলে তারা প্রত্যেকে নাম প্রত্যহার করে নেবে। শেষমেশ দক্ষিণ আফ্রিকার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয় ব্রান্ডেজ। তাঁর রাগের একটা কারণ হতেই পারে অলিম্পিক Olympic Project for Human Rights নামের যে সংগঠনের সদস্য ছিলেন টমি এবগ কার্লোস এবং যাদের পরিকল্পনা মাফিক “the greatest spectacle on earth” এর পোডিয়ামে নিজেদের দাবী তুলে ধরেছিলেন তারা, সেই সংঠনের দাবি ছিল ব্রান্ডেজকে অলিম্পিক কর্তার পদ থেকে সরতে হবে। যাই হোক, ভিলেজ থেকে বের করে দিলেও দেশের মানুষ সাদরে বরণ করে নেয় তাদের দুই হিরোকে।
 
এতক্ষণ পড়ার পর মনে হতেই পারে গল্পটা এই দুজন কালো মানুষের জিতে যাওয়ার গল্প। আজ্ঞে না।
 
বরঞ্চ গল্পটা ওই তিন নম্বর মানুষকে নিয়ে। পিটার নর্ম্যান। অস্ট্রেলিয়ার দৌড়বীর, দ্বিতীয় হয়েছেন, ঘরে ফিরে পেতেই পারতেন বীরের সম্মান। ১০ বছর আগের ধরা পড়ে ছিল গ্যংগ্রিন, পা টাই হয়ত বাদ দিতে হত, সেখানে থেকে ফিরে এসে ্নিজের জুতো না থাকায় ধার করা জুতোয় অলিম্পিকে পদক জয়। গাথা তৈরি করার মত আদর্শ গল্প। কিন্তু সেদিনটা ছিল খেলাধুলোর ইতিহাসে আর ৫ টা দিনের থেকে আলাদা যেখানে শুধু মাত্র ওই মেডেলটা দিয়ে নায়কদের বোঝা যাবে। অলিম্পিক তো শুধু ৪ বছরের স্বপ্ন গড়ার বা ভাঙ্গার জায়গা নয়, বরং নিজদের গল্প বলার যায়গা। সেখানে বিজয়ী আর বিজিতরা দুজনেই গল্প বলে, বাকি ৫ জন সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা হওয়ার গল্প। শিক্ষক নর্ম্যান তাঁর ধার করা জুতোর সাথেই মেনে চলতেন মূল্যবোধকে। তিনি টমি আর কার্লোসের পরিকল্পনা জানতেন। কিছুদিন আগে টমাস বাচ বললেন না , “ in Olympic village we share values” , সেই মূল্যবোধের আদান প্রদান হয়েছিল। তিনজনে যখন মেডেল নিতে যাবেন তখন টমি দেখলেন তিনি তাঁর কালো গ্লাভস টা আনতে ভুলে গেছেন। নর্ম্যান বলেন কার্লোসের গ্লাভসটা দুজনে ভাগাভাগি করে পরে নিতে। এই অব্দি হয়ত তাও ঠিক ছিল । কিন্তু তারপর পিটার নর্ম্যান চেয়ে বসলেন Olympic Project for Human Rights এর ব্যাজ। বুকে সেই ব্যাজ লাগিয়ে মেডেল নিতে উঠলেন তিনি।
 
কী দরকার ছিল তাঁর? জিজ্ঞেস করলেন টমি স্মিথ। তুমি আমেরিকাতেও থাক না, কালোও নও তোমাকে কোন দিন আমাদের মত অবিচারের স্বীকার হতে হবে না তাহলে আমাদের জন্য কেন করবে তুমি?
উত্তরে স্মিত হাস্যে নর্ম্যান জানান- । I believe in Human Rights. I will stand with you “ আমি মানবাধিকারে বিশ্বাস করি”. এই চেতনার সাথেই আমার বেড়ে ওঠা।
 
যেটা টমি স্মিথ রা জানেননি বা নর্ম্যান বললেনি তা হল নর্ম্যান নিজে অস্ট্রেলিয়ার আদি অধিবাসীদের একজন ছিলেন এবং সময়ে সময়ে তাদের অধিকারও ক্ষুণ্ণ হয়। তাই সেদিন নর্ম্যান যা করেছিলেন তা তাঁর চেতনা দ্বারা চালিত হয়েই করেছিলেন। প্রমাণ করেছিলেন যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অধিকারের কথা বলার জন্য সেই গোষ্ঠীর মধ্যে থাকতে হয় না। যা ভুল তা ভুলই। আর সেই ভুলের বিরুদ্ধে যদি তোমাকে দাঁড়াতে হয় , তাহলে তোমার দাঁড়ানো উচিত, সকলের বিপক্ষে গিয়েও।
 
574779-peter-norman
 
দেশে ফেরার পর টমি আর কার্লোসের মত তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। তাঁর দুঃসাহসের জন্য এক ঘরে করে দেয় তাঁর নিজের দেশের অলিম্পিক কমিটি এবং দেশের মানুষ। বিশ্ব র্যাঙ্কিঙ্গ এ ৫ নম্বর হয়া সত্ত্বেও তাকে পরের অলিম্পিকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় তাঁর দেশ।একের পর এক প্রতিযোগিতা থেকে নাম বাদ পড়তে থাকে দেশের সেরা অলিম্পিয়ানের। ৩ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ানশিপে জিতলেন তাও মিউনিখে পাঠালো না!! মদে আর হতাশায় ডুবে যেতে যেতে দেশের এককালের শ্রেষ্ঠ দৌড়বিদ এই আশায় বেঁচে থাকেন যে দেশে যখন ২০০০ সালে অলিম্পিকের আসর বসবে তখন নিশ্চয় আমাকে ডাকবে। ভুল ছিলেন তিনি। দেশের সব অলিম্পিয়ানদের ডাকা হলেও, ডাকা হয়নি তাকে। কারণ দেখায় অস্ট্রেলিয়ার অলিম্পিক কমিটি- টাকার অভাব।
 
আমেরিকা কিন্তু ভোলেনি। ২০০০ সালে আমেরিকার দল নিজের গরজে ডেকে পাঠায় সেই লোকটিকে যে নিজের আদর্শের জন্য আমেরিকার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল একদিন। সব উপেক্ষা আর বঞ্চনা মাথায় নিয়ে ২০০৬ সালে মারা যান নর্ম্যান। তাঁর কফিন বয়েছিলেন তাঁর দুই বন্ধু টমি স্মিথ আর জন কার্লোস- একদিনের যাদের অধিকারের জন্য নিজের কেরিয়ার বিসর্জন দিয়েছিলেন পিটার নর্ম্যান। এই ছবি হুহু করে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। লাইফ ম্যাগাজিন এই ছবিটাকে ২১ শতকের অন্যতম ২০ টা প্রভাবশালী ছবির একটা বলে আখ্যয়িত করেন।
যে পিটার নর্ম্যান বেঁচে থাকতে মর্যাদা পাননি তাঁর জন্য আমেরিকার একাধিক শহরে তৈরি হল তিনজনের মূর্তি। তাঁর মধ্যে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যেখানে পিটার নর্ম্যানের জায়গা খালি রেখে বাকি দুজনের মূর্তি গড়া হয় এবং বলা হয় যারা নর্ম্যানের মত আদর্শে বিশ্বাসী তারা সেখানে গিয়ে ছবি তুলতে পারবেন নর্ম্যানের জায়গায় দাড়িয়ে। অনেক মানুষ সেখানে ছবি তোলেন। হয়ত দেখে হাসেন এককালের ব্রাত্য নর্ম্যান। ২০১৬ সালের সেপ্টম্বরে আমেরিকার ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ আফ্রিকান আমেরিকান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচারে তাঁর মূর্তি বসানো হয়, স্মিথ আর কার্লোসের সাথে। তবে মারা যাওয়ার পর তাঁর দেশের মানুষ তাদের নিজেদর ভুল বুঝতে পারে এবং ২০১০ সালে অ্যাথলেটিক অস্ট্রেলিয়া তাদের হল অফ ফেমে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করে এবং ২০১৮ সালে অলিম্পিক কমিটি তাকে মরণোত্তর অর্ডার অফ মেরিট প্রদান করে, মেডেল জয়ের ৫০ বছর পর।
 
যে দেশ তাকে একদিন দূরে ফেলে দিয়েছিল সেই দেশ তাঁর মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে পালন করে পিটার নর্ম্যান ডে, ৯ অক্টোবর।
নর্ম্যান মারা গিয়েও শেষ হাসি টা হেসেছিলেন যেদিন অ্যান্দ্রু লেই এর নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্ট সারা দেশের পক্ষ থেকে দূর্ব্যাবহারের জন্য ২০১২ সালে নর্ম্যানের কাছে ক্ষমা চান। সেই ক্ষমা পত্রে একদিকে যেমন স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল নর্ম্যান অলিম্পিক বিজয়কে বা হিউমান রাইটসের ব্যাজ পরার সাহসের জন্য কুর্নিশ জানানো হয়েছিল তেমনি পার্লামেন্ট “...... apologies to Peter Norman for the treatment he received upon his return to Australia ,and the failure to recognize his inspirational role before his death in 2006. Parliament also recognizes the powerful role that Norman played in furthering racing equality.”
 
th
 
প্রায় ৫০ বছর পর আবার জিতেগেছিলেন নর্ম্যান। সেদিন তাঁর গলায় অলিম্পিকের মেডেল ছিল না। তবুও সারা দেশ উঠে কুর্নিশ জানিয়েছিল সেই সাদা চামড়ার মানুষটাকে যে নিজের আদর্শের জন্য, মানবিক মূল্যবোধের জন্য আর সাম্যের জন্য নিজেকে গোছানো কেরিয়ারকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। সেদিন পোডিয়ামে কেবল দুজন কালো মানুষ ছিলেন না যারা তাদের দাবি নিঃশব্দে জোরের সাথে রেখে ছিলেন, ছিলেন আরো একজন যাকে পরবর্তীতে সংবাদ মাধ্যমগুলি বলে “ The other man on the podium”. কালো মানুষদের অধিকার আদায়ে দাঁড়ানো একটি সাদা চামড়ার মানুষ, যাকে মানুষ ভুলে গেছিল।
বর্তমান আই ও সি প্রেসিডেন্ট টমাস বাচ বলেন “……we will be united by our shared values and emotions. This makes each one of us the member of the unique Olympic Community. This community will show the entire world that our shared humanity is stronger than all the forces want to divide us.” নর্ম্যান থেকে যান সেই মানবতার মূর্ত স্বরূপ হয়ে ।
 
 
 
ছবি কৃতিত্বঃ গুগল।