• মেসির দলবদল
  • " />

     

    মেসির ইউ-টার্ন : যে ১০ প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন আপনি

    বার্সেলোনা ছাড়তে চেয়ে দুনিয়াই কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। ১০ দিনের নাটকীয়তা শেষে আবার বার্সেলোনাতে থাকার কথা জানিয়ে সেই উত্তাপে আরেক দফা ঘি ঢেলেছেন বার্সেলোনা অধিনায়ক। তর্কসাপেক্ষে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় যিনি, তার দলবদল নিয়ে অনেকরকম খবর ছাপা হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে এর ভেতর গুজব আর ভুয়া খবরও কম নয়। আবার সব সত্যও স্পষ্ট নয়। গোলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসির ভাষ্য অনুযায়ী বিশ্লেষণ করে একেবারে আসল ঘটনাই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। লিখেছেন রিফাত মাসুদ।


    ১. লিওনেল মেসি কী বার্সেলোনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন?

    গোলকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অনুযায়ী লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি। বরং ক্লাব ছাড়ার প্রক্রিয়ায় বার্সেলোনাকে নিয়ে আদালতে যেতে হত বলে এই মুহুর্তে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

    “এই ক্লাব আমাকে সব দিয়েছে। আমি এখানে জীবন গড়েছি। এটা আমার প্রাণের ক্লাব। এই ক্লাব নিয়ে আমি আদালতে উঠব- সেটা কোনোদিন ভাবতেও পারি না আমি।”- বলেছেন মেসি নিজেই।

    ২০১৭ সালে বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির চুক্তি অনুযায়ী শেষ বছরে (২০২০) স্বেচ্ছায় চুক্তি বাতিল করতে পারতেন মেসি। কিন্তু সেটি ক্লাবকে জানাতে হত ১০ জুনের আগে। আর মেসি বার্সেলোনা ছাড়ার ব্যাপারে ব্যুরোফ্যাক্স পাঠিয়েছিলেন আগস্টের ২৪ তারিখ। মেসির আইনজীবিরা দাবি করেছিলেন করোনাভাইরাসের কারণে মৌসুমের সময়সূচী বদলে যাওয়ায় একক ইচ্ছায় চুক্তি বাতিলের শর্তটি বলবত আছে। আর বার্সা দাবি করেছিল, সেই সময় ১০ জুনেই ফুরিয়ে গেছে। এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা করার দুইটি উপায় ছিল মেসির ভাষ্যমতে। এক, কোনো ক্লাবের ৭০০ মিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করা। যেটা বাস্তবিকভাবে অসম্ভব। দুই, আদালতের বিচারের অপেক্ষা করা।

    "আমি নিশ্চিত ছিলাম আমাকে যেতে দেওয়া হবে। প্রেসিডেন্ট আমাকে সবসময় বলে এসেছেন, মৌসুম শেষে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারব। পরে তারা দাবি করে বসল আমি ১০ জুনের আগে জানাইনি। কিন্তু তখন আমরা করোনাভাইরাসের কারণে মৌসুমের মাঝপথে। এই করোনাভাইরাস মৌসুমের সময় বদলে দিয়েছে।"  




    ২. বার্তোমেউয়ের সঙ্গে ঝামেলার জেরে বার্সেলোনা ছাড়তে চেয়েছিলেন মেসি?


    ক্লাব প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া বার্তোমেউর সঙ্গে ঝামেলার কথা মেসি তার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেননি। তবে বলেছেন, বার্তোমেউকে তিনি মৌসুমের শুরুতেই জানিয়েছিলেন বার্সেলোনা ছাড়ার কথা, আর বার্তোমেউ তাকে বলেছিলেন, মৌসুম শেষে সিদ্ধান্ত নিতে।

    মেসির ভাষ্যমতে, বার্তোমেউ তাকে দেওয়া কথা রাখেননি, “আমি পুরো বছর জুড়েই প্রেসিডেন্টকে বলছিলাম যে, আমি ক্লাব ছাড়তে চাই। আমার ক্যারিয়ারে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের সময় এসে গেছে। তবে সে আমাকে সময় বলেছে, ‘আমরা কথা বলব, তবে এখন নয়, এটা-সেটা। প্রেসিডেন্টের কথা শুনে তখন বুঝতেই পারিনি তিনি আসলে কী বলতে চেয়েছেন।”

    “আমি ক্লাব ছাড়তে চাই, এই বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই ব্যুরোফ্যাক্স পাঠিয়েছিলাম। আর আমি ফ্রি-তে ক্লাব ছাড়তে পারি এবং চাইলে আরও এক বছর থাকার সুযোগ আছে। তবে সেই সুযোগ না নিয়ে বরং এখনই ক্লাব ছাড়তে চাই, এটাই ব্যুরোফ্যাক্সে উল্লেখ করা হয়েছিল।”

    “এটা শুধু আমার সিদ্ধান্তটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল। কোনো সমস্যা তৈরি অথবা ক্লাবের বিরুদ্ধে অবস্থান জানানোর জন্য নয়। আমি যদি ব্যুরোফ্যাক্স না পাঠাতাম, তার মানে হত যে, আমি ক্লাবে আরও এক বছর থাকতে চাই। তারা বলছে যে আমি ১০ জুনের আগেই জানাইনি। তবে আমি আবারও বলছি, তখন আমরা সব প্রতিযোগিতায় খেলার মাঝে ছিলাম, সেটা সঠিক সময় ছিল না।”

    ৩. মেসির কি বেতন বাড়ছে? বার্সেলোনাতেই ক্যারিয়ার শেষ  হবে মেসির?

    না, বেতন বাড়ছে না। ২০১৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী ধার্য হওয়া বেতনই পাবেন মেসি। যেটা বছরে ১০৩ মিলিয়ন ইউরো।

    ক্যারিয়ার কোথায় শেষ করবেন এ বিষয়েও কোনো কথা বলেননি মেসি। তবে আপাতত ২০২০-২০২১ মৌসুম পর্যন্ত থাকছেন তিনি। তার সঙ্গে বার্সার চুক্তির মেয়াদ ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত যা পরিস্থিতি, তাতে ওই মেয়াদ ফুরোলেই বার্সা ছাড়বেন মেসি। তবে এর ভেতর অনেক কিছুই পরিবর্তন হতে পারে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে, মেসির জন্য দুই বছরের চুক্তির প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে বার্সা। যে কোনও সময় চাইলেই তাতে স্বাক্ষর করতে পারেন মেসি। আর নতুন প্রেসিডেন্টও মেসিকে রাখতেই চাইবেন, সেটাও নিশ্চিত।

    ৪. বিকেলে বিবৃতি দিয়ে রাতে আবার উলটো পথে হাঁটলেন কেন মেসি?
    গোলের ওই সাক্ষাৎকারে এই প্রশ্নের জবাবও পাওয়া যায়নি। তবে মেসি বেশ কয়েকবারই বলেছেন, "ক্লাব ছাড়তে চাওয়ার অধিকার আমার আছে।" মেসির এই কথা ইঙ্গিত করছে আইনগত দিক দিয়ে তারও যে একটি অবস্থান রয়েছে সেটিই পরিস্কার করতে চাইছেন তিনি। বিবৃতি দিয়েও নিজের অবস্থানটাই জানান দিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী। আর যেহেতু অবস্থার সুরাহা করতে আদালতমুখী হতে হত, তাই আর ওই পথে হাঁটেননি তিনি।

    ৫. বার্তোমেউয়ের ভবিষ্যৎ কী?

    বার্তোমেউও প্রেসিডেন্ট পদে থাকছেন। ২০২১ সালের মার্চে বার্সেলোনার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দুই দফায় প্রেসিডেন্ট থাকার পর বার্তোমেউ এবার আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ওই নির্বাচনে কে জয়ী হয় তার ওপর মেসির বার্সায় থাকা না থাকার ভাগ্য নির্ভর করতে পারে।

    ৬. এই লড়াইয়ে কে জিতলেন, কে হারলেন?

    অবস্থার বিচারে মনে হচ্ছে বার্তোমেউ জিতলেন, আর হেরে গেলেন মেসি। ক্লাব ছাড়তে চেয়েছিলেন, এখন একরকম বাধ্য হয়েই থেকে যেতে হচ্ছে তাকে। আর বার্সেলোনা শুরু থেকেই যে অবস্থান নিয়েছিল, তাতেই অনড় থাকল।

    ৭. মেসি কেন ক্লাব ছাড়তে চেয়েছিলেন?

    গোলকে দেওয়া সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করলে তার অর্থ দাঁড়ায়, ক্লাব হিসেবে বার্সেলোনা যেদিকে যেভাবে এগুচ্ছে সেটা মেসিকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ক্যারিয়ারের শেষদিকে এসে মেসি শিরোপা জিততে চান, বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগ। তবে ইউরোপে বার্সেলোনার গত কয়েক মৌসুমের ব্যর্থতা মেসিকে বার্সেলোনা ছাড়ার কথা ভাবতে সাহায্যই করার কথা। ক্লাবের কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রজেক্ট না থাকাকেও দায়ী করেছেন মেসি। 

    “আমার মনে হয়েছিল, ক্লাবের এখন তরুণ, নতুন খেলোয়াড় দরকার। আমি ভেবেছিলাম বার্সেলোনায় আমার সময় শেষ। তবে এটা ভাবতেও আমার খুবই কষ্ট হচ্ছিল, কারণ আমি সবসময়ই বলে এসেছি, বার্সেলোনায় আমি ক্যারিয়ার শেষ করতে চাই।”

    “আর সত্যি বলতে এখানে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রজেক্ট নেই। তারা শুধু কোনো সংকট তৈরি হলে সেটা ঢাকার চেষ্টা করে। আমি আগেই বলেছি, আমি সবসময়ই আমার পরিবার এবং ক্লাবের কল্যাণের কথা ভাবি।”

    ৮. বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হারের পর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেসি?

    বায়ার্নের কাছে ৮-২ গোলের হার হতাশা বাড়িয়েছে মেসির, হয়ত বার্সা ছাড়তে চাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে বড় জ্বালানি হিসেবেও কাজ করেছে সেটা। তবে মেসি জানিয়েছেন, মৌসুম শুরু সময়ই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন নতুন কিছুর সময় হয়েছে তার ক্যারিয়ারে, “এই বছরটি অনেক কঠিন ছিল। আমি অনুশীলনে, খেলায় এবং ড্রেসিং রুমে অনেক কষ্ট পেয়েছি। আমার জন্য সবকিছুই কঠিন হয়ে উঠছিল, আর তখনই একটা সময় আমি নতুন লক্ষ্য খোঁজার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”

    ৯. মেসি ‘নাটক’ করলেন?

    গোলের ভিডিওটি দেখার পর মেসি ক্লাব ছাড়ার নাটক করেছেন সেটি বিশ্বাস করা আসলেই কঠিন। বিশেষ করে পুরো পরিবারের কান্নায় ভেঙে পড়ার গল্প বলতে গিয়ে মেসি নিজেই আবেগতাড়িত হয়ে গিয়েছিলেন। সে বিচারে এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত নাটকে পরিণত হলেও, মেসি নাটক করেছেন এমন দাবি করা প্রায় অযৌক্তিকই।

    “পরিবারকে বার্সেলোনা ছাড়ার কথা জানানোর পর এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি হয়েছিল। সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। আমার সন্তানরা বার্সেলোনা ছাড়তে চায়না, স্কুলও বদলাতে চায় না।”

    “থিয়াগো বয়সে বড়। ও ব্যাপারগুলো বুঝতে পারে কিছুটা। আমি চায়নি ওকে জানাতে। টিভিতে খবর দেখে জেনেছে ও। পরে আমার কাছে কাঁদতে কাঁদতে এসে বলেছে আমরা যেন বার্সেলোনা না ছাড়ি।”  - বার্সেলোনা ছাড়ার খবর পরিবার কীভাবে নিয়েছিল সে বিষয়ে গোলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি।  

    ১০. বার্সেলোনা সমর্থকেরা মেসিকে এখন কোন চোখে দেখবেন?

    এই জবাব আসলে ভবিষ্যতের হাতেই তোলা। তবে মেসি বার্সেলোনা ছাড়তে চাওয়ার পর যেভাবে সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে এসেছিলেন তা প্রমাণ করেছে দুইপক্ষের সম্পর্ক অটুট থাকবে। তবে এই ঘটনায় নিশ্চিতভাবেই বার্সার একটি সমর্থকগোষ্ঠী মেসিকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। গত কয়েকদিন বোর্ডের কেউ কেউ মেসিকে বার্সায় চান না বলেও খবর প্রচারিত হয়েছে। মেসি কিছু ‘শত্রু'-ও হয়ত পেয়ে গেছেন এবার! 

    মেসির দলবদল নিয়ে আরও খবর

    বার্সেলোনায় 'বোমা': ক্লাব ছাড়তে চান লিওনেল মেসি

    বার্সেলোনা ছেড়ে কোথায় যাবেন মেসি?

    বার্সা ছাড়ছেন মেসি: যে ৭ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন আপনি

    মেসিকে ৩ বছর প্রিমিয়ার লিগে খেলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিও দিতে চায় সিটি

    আইনি লড়াইয়ে মেসির চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে বার্সেলোনা

    লিওনেল মেসি : ন্যাপকিনে শুরু ফ্যাক্সে শেষ?

    বার্সেলোনায় মেসির যত চুক্তি

    আপোস করতে চান মেসি, বার্সার অনুশীলনে যোগ দেওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা

    করোনা পরীক্ষায় অংশ নিতে আসেননি মেসি

    মেসিকে নিয়ে লা লিগার বিবৃতি, ৭০০ মিলিয়ন ইউরোই পরিশোধ করতে হবে

    মেসির জন্য ম্যান সিটির ৫৫০ মিলিয়ন ইউরোর প্যাকেজ

    রিলিজ ক্লজের খবর ভুল বলে বিবৃতি দিয়েছেন মেসি, লা লিগার পাল্টা বিবৃতি

    বার্সেলোনায় থাকছেন লিওনেল মেসি

    যে কারণে বার্সেলোনা ছাড়তে চেয়েছিলেন মেসি

    বার্সেলোনার বিপক্ষে আদালতে যেতে চাননি মেসি, তাই থেকে গেলেন বার্সায়

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন